আমাদের শরীরের বিপাক, হরমোনের ভারসাম্য আর ইনসুলিনের কার্যকারিতা- সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ঘুমের সম্পর্ক। সুস্থ জীবনের নেপথ্যে ঘুমের ভূমিকা অনেকটাই গভীর। আমরা প্রায়ই সুষম খাদ্য আর শরীরচর্চার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলি, অথচ ভালো ঘুমও যে শরীরের জন্য সমান জরুরি- তা অনেক সময়ই নজর এড়িয়ে যায়। সম্প্রতি এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ঘুম ও ডায়াবেটিসের সম্পর্ক নিয়ে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
গবেষকদের মতে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ঘুম রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
কম ঘুমে বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি! ছবি: সংগৃহীত
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরে তৈরি হওয়া ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয় এবং ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে তা শেষ পর্যন্ত টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ঘুম শরীরের বিপাকক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য় করে। বজায় রাখে হরমোনের ভারসাম্য এবং ইনসুলিনও শরীরে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে।
কম ঘুম হলে কী ঘটে?
দিনের পর দিন যদি কারও পর্যাপ্ত ঘুম না হয়, তাহলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব পড়ে। ঘুমের ঘাটতি হলে শরীরে কার্টিসল-সহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। এতে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে শুরু করে।
এছাড়া কম ঘুমের কারণে খিদে নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনেও পরিবর্তন আসে। ফলে খিদে বাড়ে, বেশি খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে পারে। এই অতিরিক্ত ওজন আবার ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ছবি: সংগৃহীত
ঘুম বেশি হলেও সমস্যা!
গবেষণাটিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। শুধু কম ঘুম নয়, অতিরিক্ত ঘুমও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। যদি কেউ প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সাড়ে ৭ ঘণ্টার বেশি ঘুমান, সেটিও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ, খুব কম বা খুব বেশি- দু'ধরনের ঘুমই শরীরের বিপাকক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সপ্তাহান্তের ঘুম কি ঘাটতি পূরণ করে?
কর্মব্যস্ততার কারণে অনেকেই সপ্তাহের দিনগুলোতে কম ঘুমোন এবং সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করেন। গবেষকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে এই 'ক্যাচ-আপ স্লিপ' সাময়িকভাবে ঘুমের ঘাটতিতে কিছুটা প্রভাব কমাতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য সবচেয়ে উপকারী হল প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ও পর্যাপ্ত ঘুম।
ঘুম ভালো যাঁর সব ভালো তাঁর। ছবি: সংগৃহীত
কেন ঘুম এত গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ জীবনের তিনটি স্তম্ভ হল সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শরীরের বিপাকক্রিয়া ঠিক রাখে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা অসুখের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
তাই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ডায়াবেটিসসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে ঘুমকে অবহেলা করা যাবে না। প্রতিদিনের জীবনে যেমন আমরা খাবার ও শরীরচর্চাকে গুরুত্ব দিই, তেমনই নিয়মিত ও পরিমিত ঘুমও হওয়া উচিত সুস্থ জীবনের অপরিহার্য অভ্যেস।
