তেহরান-সহ ইরানে একের পর এক তেল ডিপো ও শোধনাগারে ইজরায়েলি মিসাইল হানায় বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকেছে গোটা দেশের আকাশ। বিভিন্ন জায়গায় 'ব্ল্যাক রেন' বা 'কালো বৃষ্টি'র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগ বাড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। এই অদ্ভুত বৃষ্টির ফোঁটায় থাকে দূষণকারী কণা ও তেলের অবশিষ্টাংশ, যা শ্বাসযন্ত্র-সহ শরীরে নানা সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সতর্কবার্তা এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য় সংস্থার (হু) তরফেও।
কী এই 'ব্ল্যাক রেন'?
'ব্ল্যাক রেন' হল এমন বৃষ্টি, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিশে থাকে ধোঁয়া, ছাই, তেলে বা শিল্প দূষণের সূক্ষ্ম কণা। দূষিত বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নামার সময় বৃষ্টির ফোঁটা এসব কণাকে টেনে নিয়ে মাটিতে নামে। ফলে বৃষ্টির রং কালচে বা তেলতেলে দেখাতে হয়। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন অ্যাটমোসফেরিক স্ক্যাভেঞ্জিং। এ ধরনের ঘটনা সাধারণত দেখা ঘটে-
- বড় তেল খনি বা শোধনাগারে বিস্ফোরণের পরে
- ভয়াবহ দাবানলের সময়
- শিল্প কারখানার দূষণ ছড়িয়ে পড়লে
- আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর
- পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর
ইরানের ক্ষেত্রে, জ্বলতে থাকা তেল ডিপো থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, হাইড্রোকার্বন ও সালফারজাত যৌগ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। পরে তা আর্দ্রতার সঙ্গে মিশে বৃষ্টির মাধ্যমে নেমে আসতে পারে।
ইরানের তেল ডিপোতে ইজরায়েলি মিসাইল হানা। ছবি: সংগৃহীত
কেন সতর্ক করল হু?
হু-র মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেইয়ারের কথায়, তেল মিশ্রিত বৃষ্টি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তেল পোড়া ধোঁয়ায় থাকে ব্ল্যাক কার্বন নামের সূক্ষ্ম কণা, যা খুব সহজেই ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যেতে পারে। এর সঙ্গে থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক যেমন পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAHs) এবং নিকেল বা ভ্যানাডিয়ামের মতো ধাতব কণাও। এসব উপাদান শ্বাসনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
‘ব্ল্যাক রেন’-এর প্রভাব কি ভারতেও পড়তে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দূষিত বৃষ্টি সাধারণত ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ ধোঁয়া, ছাই ও তেলের সূক্ষ্ম কণা বায়ুমণ্ডলে বেশি দূর যেতে পারে না এবং দ্রুতই বৃষ্টির মাধ্যমে নেমে আসে। তাই ইরানের এই পরিবেশগত ঘটনায় ভারতের আবহাওয়া বা স্বাস্থ্যে বড় কোনও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
কালো ধোঁয়ায় ঢেকেছে আকাশ। ছবি: সংগৃহীত
স্বাস্থ্যে সম্ভাব্য প্রভাব
ব্ল্যাক রেনের কারণে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে-
শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা: ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা শ্বাসনালীকে হাইপারঅ্য়াকটিভ করে। হাঁপানি বা ব্রঙ্কাইটিসের রোগীদের সমস্যা বাড়তে পারে।
চোখ ও ত্বকের জ্বালা: দূষিত বৃষ্টির জল ত্বকের সংস্পর্শে এলে র্যাশ বা জ্বালার সমস্য়া দেখা দিতে পারে, চোখেও দেখা দিতে পারে অস্বস্তি।
বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ: তেলজাত রাসায়নিক, ভারী ধাতু বা অ্যাসিডিক উপাদান শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি: দীর্ঘ সময় এসব দূষণের সংস্পর্শে থাকলে ক্যানসার বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি ফসল ও জলের উৎসও দূষিত হতে পারে।
ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক রেন’
এই ঘটনা খুব বিরল হলেও কয়েকবার এর নজির রয়েছে।
হিরোশিমা, ১৯৪৫: জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর ছাই, ধ্বংসাবশেষ ও তেজস্ক্রিয় কণা মিশে ব্ল্য়াক রেইন হয়েছিল। পরে অনেকের মধ্য়ে বিকিরণজনিত অসুখ দেখা দেয়।
গলফ যুদ্ধ, ১৯৯১: কুয়েতে শত শত তেলকূপে আগুন লাগার পর তৈরি হয় বিশাল ধোঁয়ার মেঘ এবং হয় তেল মিশ্রিত বৃষ্টিও।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাস্ক মাস্ট। ছবি: সংগৃহীত
কী কী সতর্কা দরকার?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি সতর্কতার কথা বলছেন-
- সম্ভব হলে ঘরের ভেতরে থাকা
- দূষিত বৃষ্টির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
- বাইরে গেলে মাস্ক, সম্ভব হলে এন৯৫ মাস্ক ব্য়বহার করুন
- দরজা, জানালা বন্ধ রাখুন
- ফল, সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন
ইরানের এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিবেশগত দূষণ কত দ্রুত জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে বৃষ্টিও দূষিত হতে পারে। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিবেশগত বিপর্যয়ের সময় বায়ুদূষণে নজরদারি, সতর্কতা জারি করা এবং সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।
