রাত একটু গড়িয়েছে। পেট ভরা, তবুও মন চাইছে কিছু একটা, হয়তো চকোলেট বা চিপস বা এমন কিছু মুচমুচে, যা মুখে দিলেই ভালো লাগবে। এই অদ্ভুত টানটাই হল 'ক্রেভিং' বা 'খাই খাই'। অনেকেই এটাকে খাবারের প্রতি দুর্বলতা ভাবেন, কিন্তু আসলে এটা আপনার শরীর আর মনের এক সূক্ষ্ম ভাষা।
ক্রেভিং কখনওই হঠাৎ আসে না। এর পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের কেমিস্ট্রি, হরমোনের ওঠানামা, এমনকী আপনার মুড আর জীবনযাপনও। এক কথায়, এটা শুধু খাবারের ইচ্ছা নয়- এটা একটা সংকেত।
ছবি: সংগৃহীত
শরীরের ভেতরের গল্প
যখন আপনি চিনি, নুন বা ফ্যাটযুক্ত খাবার খান, তখন মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা আপনাকে তৎক্ষণাৎ আনন্দ দেয়। এই অনুভূতিটাই মস্তিষ্ক মনে রাখে। ফলে পরের বার মন খারাপ, ক্লান্তি বা একঘেয়েমি এলে সেই একই খাবারের দিকে টান পড়ে।
এদিকে ঘ্রেলিন (খিদে বাড়ায়) আর লেপ্টিন (পেট ভরার সংকেত দেয়) নামের হরমোন দু'টি খাওয়ার নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম কম হলে বা খাওয়ার সময় এলোমেলো হলে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, আর তখন না চাইলেও খেতে ইচ্ছে করে।
মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করে কেন?
মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ খুব সহজ, শরীর দ্রুত শক্তি চায়। রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেলে শরীর মিষ্টি খাবার খোঁজে। তবে শুধু শরীর নয়, মনও এখানে ভূমিকা রাখে। স্ট্রেস বা ক্লান্তির সময় মিষ্টি খেলে সাময়িকভাবে ভালো লাগে। কিন্তু বারবার এই অভ্যেস তৈরি হলে ভবিষ্যতে ইনসুলিনের সমস্যা বা ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
নোনতা খাবারের টান কী বোঝায়?
হঠাৎ নোনতা কিছু খেতে ইচ্ছে করলে সেটাও একটা বার্তা। অনেক সময় শরীর ডিহাইড্রেটেড হলে বা ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হলে এমনটা হয়। এছাড়া মানসিক চাপও এর একটি কারণ। স্ট্রেসের সময় শরীরের ভেতরে কিছু পরিবর্তন হয়, যা নোনতা খাবারের প্রতি টান বাড়ায়। তবে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত নুন শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
ক্রাঞ্চি খাবার এত ভালো লাগে কেন?
চিপস বা ভাজাভুজি খেতে ভালো লাগে শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং সেই 'ক্রাঞ্চ' অনুভূতির জন্য। মচমচে শব্দ আর টেক্সচার মস্তিষ্ককে আলাদা এক ধরনের তৃপ্তি দেয়। আরও একটা বিষয় আছে, চিবানো নিজেই একটা স্ট্রেস রিলিফ। তাই মন খারাপ, বিরক্তি বা একঘেয়েমি কাটাতে অনেকেই অজান্তে এই ধরনের খাবারের দিকে ঝোঁকেন।
ছবি: সংগৃহীত
তাহলে কী করবেন?
- ক্রেভিংকে দমনের চেষ্টা না করে, তাকে বুঝতে শেখা
- পরিমিত পরিমাণ জলপান করুন
- নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খান
- দরকার পর্যাপ্ত ঘুম
- স্ট্রেস কমানোর জন্য হাঁটা, ব্যায়াম বা মেডিটেশন করুন
- নিজের কাছে প্রশ্ন করুন, 'আমি কি সত্যিই ক্ষুধার্ত, নাকি শুধু কিছু খেতে ইচ্ছে করছে?'
ক্রেভিং বা খাই খাই কোনও সমস্যা নয়, এটা আপনার শরীরের ভাষা। আপনি যদি সেই ভাষা বুঝতে পারেন, তাহলে খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক বদলে যাবে। সব সময় নিজেকে আটকে রাখার দরকার নেই। বরং বুঝে, শুনে, সামলে খাওয়াটাই আসল।
