এতদিন আমরা জেনে এসেছি, মুখের যত্ন মানেই জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াকে সম্পূর্ণভাবে দূর করা। তাই টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ বা অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রোডাক্ট, সবকিছুর লক্ষ্য এক- জীবাণুমুক্ত মুখ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুখের সব ব্যাকটেরিয়া খারাপ বা ক্ষতিকর নয়। বরং আমাদের মুখে যে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু বাস করে, তাদের অনেকেই শরীরের জন্য উপকারী। মুখের অভ্যন্তরে এই ভালো-মন্দ ব্যাকটেরিয়া মিলে তৈরি করে এক ভারসাম্যপূর্ণ ইকোসিস্টেম, এই পুরো ব্যবস্থাকে বলা হয় ওরাল মাইক্রোবায়োম।
অতিরিক্ত পরিষ্কারে হিতে বিপরীত! ছবি: সংগৃহীত
ভালো ব্যাকটেরিয়া মুখের অভ্যন্তরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তারা ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে, মুখের pH ব্যালেন্স ঠিক রাখতে সাহায্য করে, মাড়ি ও দাঁতের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এমনকী শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গেও এদের যোগ রয়েছে। ফলে এই ভারসাম্য ঠিক থাকলে শরীরে সংক্রমণ বা প্রদাহের ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আমরা ‘অতিরিক্ত পরিষ্কার’-এর দিকে ঝুঁকে পড়ি। ঘন ঘন শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে, শুধু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াই নয়, উপকারী ব্যাকটেরিয়াও নষ্ট হতে পারে। এর ফলে নষ্ট হয় মুখের অভ্যন্তরে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য। একে বলা হয় ডিসবায়োসিস। অর্থাৎ, মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্যহীনতা।
এই অবস্থায় মুখ হয়ে পড়ে সংবেদনশীল। মাড়ির রোগ, মুখের দুর্গন্ধ, বারবার সংক্রমণ বা প্রদাহের মতো সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অর্থাৎ, অতিরিক্ত পরিষ্কার করতে গিয়ে উল্টে ক্ষতি!
থাকুক ভালো-মন্দের ভারসাম্য। ছবি: সংগৃহীত
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- মুখের স্বাস্থ্য মানে শুধু দাঁতের যত্নই নয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মুখের খারাপ ব্যাকটেরিয়া শরীরের অন্য অংশে, বিশেষ করে অন্ত্রে পৌঁছলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। এর ফলে প্রদাহ দেখা দিতে পারে, যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা হজমজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মনে রাখুন, মুখ পরিষ্কার রাখা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু পরিষ্কার মানেই সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া-মুক্ত নয়। সুস্থ থাকতে গেলে কখনও কখনও শরীরের ভেতরের এই অদৃশ্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখা অত্য়ন্ত জরুরি।
এই কারণেই এখন বিশেষজ্ঞরা মুখের যত্নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছেন। লক্ষ্য হওয়া উচিত সব ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করা নয়, বরং একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখা। তাই এমন টুথপেস্ট বা অভ্যেস বেছে নেওয়া দরকার, যা মুখের স্বাভাবিক পরিবেশকে রক্ষা করে।
