সারাদিনের ব্যস্ততা শেষ। কাজের চাপ, ডেডলাইন, অফিস যাতায়াত, সংসারের নানা দায়িত্ব— সব সামলে রাতে অবশেষে বিছানায়। শরীর বলছে, ‘এবার ঘুমোও।’ চোখও ভারী হয়ে আসছে। অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছেন, সকালে আবার তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। তবু ফোনটা হাতে তুলে নিলেন। মনে হল, ‘আর পাঁচ মিনিট দেখি।’
তারপর?
একটা ভিডিও, তার পর আর একটা। মাঝখানে কয়েকটা পোস্ট, কিছু খবর, সোশাল মিডিয়ায় একটু ঘোরাঘুরি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, রাত অনেকটাই গড়িয়ে গিয়েছে। অথচ ঘুম আসার আগেই ফোনটা নামিয়ে রাখতে পারছেন না।
এটা কি শুধুই ফোনের নেশা? সবসময় নয়। অনেক ক্ষেত্রে এর পিছনে থাকে সারাদিন নিজের জন্য সময় না পাওয়ার এক অদ্ভুত মানসিক টান। মনোবিজ্ঞানে যার একটি পরিচিত নাম রয়েছে—‘রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন’ (Revenge Bedtime Procrastination)।
ঘুম নেই! ছবি: সংগৃহীত
নিজের সময়টুকু রাতেই!
সারাদিন অন্যের চাহিদা, কাজ আর দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে নিজের জন্য সময়ই পেলেন না। রাতে যখন সব কাজ শেষ, তখন মনে হয়—‘সারাদিন তো অন্যদের জন্য গেল, এবার একটু নিজের মতো থাকি।’
সেই ‘নিজের সময়’টুকু ছাড়তে মন চায় না। ফলে ঘুম পাচ্ছে জেনেও ঘুম পিছিয়ে দেন। বিছানায় শুয়ে ফোন দেখা, সিরিজের একটা এপিসোড, সোশাল মিডিয়ায় ঘোরাঘুরি, বাড়তে থাকে রাত। এখানে মূল বিষয় হল, আপনি ঘুমাতে পারছেন না এমন নয়। আপনি ইচ্ছা করেই ঘুমাতে যাচ্ছেন না। কারণ ঘুমিয়ে পড়লে দিনের শেষের সেই অল্প সময়টুকুও শেষ হয়ে যাবে।
ক্লান্ত মস্তিষ্কের সহজ বিনোদন
এর পিছনে দিনের ব্যস্ততার বড় ভূমিকা রয়েছে। কাজ, পড়াশোনা, যাতায়াত, বাড়ির দায়িত্ব—সারাদিনের তালিকায় নিজের জন্য জায়গা কোথায়? বাড়ি ফেরার পর শরীর-মস্তিষ্ক দুই-ই ক্লান্ত। তখন এমন কিছু করতে ইচ্ছে করে, যাতে বেশি পরিশ্রম নেই। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করা তার জন্য আদর্শ। বিছানায় শুয়েই করা যায়, কোনও পরিকল্পনা লাগে না, কাউকে সময়ও দিতে হয় না।
কম ঘুমে বাড়ে একাধিক স্বাস্থ্যঝুঁকি! ছবি: সংগৃহীত
কিন্তু এখানেই বিপদ। ফোনে স্ক্রল করার কোনও স্বাভাবিক ‘শেষ’ নেই। একটি ভিডিও শেষ হলেই সামনে আসে পরেরটি। একটি পোস্ট দেখার পর আরও একটি। নতুন খবর, নতুন ছবি, নতুন রিল, প্রতিটিই আপনার মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তৈরি। ফলে ‘আর একটু’ করতে করতে সময় কখন পেরিয়ে যায়, বোঝাই যায় না। যে সময়টুকু বিশ্রামের জন্য চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটাই চলে যায় ঘুমের কাছ থেকে।
আজ একটু কম ঘুম, কাল আরও ক্লান্তি
এক-দু’দিন এমন হলে সাধারণত বড় সমস্যা নয়। কিন্তু প্রতিদিন যদি ঘুমের সময় কমতে থাকে, তখন তৈরি হয় ‘স্লিপ ডেট’, অর্থাৎ, শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি।
ফলে পরের দিন ক্লান্তি, ঝিমুনি, মনোযোগ কমে যাওয়া বা কাজের গতি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। আর সারাদিন ক্লান্ত থাকার পর রাতে আবার মনে হয়, ‘আজ অন্তত নিজের জন্য একটু সময় চাই।’ এভাবেই তৈরি হয় একটা চক্র। দিনে ব্যস্ততা, রাতে নিজের জন্য সময় খোঁজা, ঘুমের সময় পিছিয়ে দেওয়া, পরের দিন ক্লান্ত হয়ে ওঠা এবং আবার সেই একই অভ্যাস।
চোখে ঘুম অথচ হাতে ফোন! ছবি: সংগৃহীত
ফোন নয়, আগে বদলান দিনের রুটিন
এই অভ্যাস ভাঙতে রাত হলেই ফোনকে ‘শত্রু’ বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং ভাবুন, কেন আপনি ঘুমের সময়টুকু নিজের জন্য ব্যবহার করতে চাইছেন? যদি সারাদিন নিজের জন্য একটুও সময় না থাকে, তাহলে দিনের মধ্যেই সেই সময়টা তৈরি করুন। খুব বেশি নয়, অল্প সময় হলেও এমন কিছু করুন যা সত্যিই আপনাকে আনন্দ দেয়।
রাতে ফোন দেখারও একটি নির্দিষ্ট সময় রাখতে পারেন। যেমন, ঘুমের আগে ৩০-৪০ মিনিট ফোন দেখবেন। তবে ‘কম ফোন ব্যবহার করব’ না বলে, কখন ফোন স্ক্রল বন্ধ করবেন, সেই সময়টা আগে থেকেই ঠিক করুন। ঘুমের আগে আলো একটু কমিয়ে দিন। ফোনটি বালিশের পাশে না রেখে দূরে রাখুন। চাইলে বই পড়া বা অন্য কোনও শান্ত কাজের অভ্যাস করতে পারেন।
শুধুই নেশা! ছবি: সংগৃহীত
মনে রাখবেন, রাত একটা পর্যন্ত স্ক্রল করে হয়তো মনে হতে পারে ‘আজ নিজের জন্য সময় পেলাম।’ কিন্তু তার বিনিময়ে যদি পরের দিনের শক্তি, মনোযোগ আর স্বস্তিটুকু হারিয়ে যায়, তাহলে আসলে নিজের কাছ থেকেই আরও বেশি সময় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
তাই এই অভ্যাসকে শুধু ‘ফোনের নেশা’ বা ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ বলে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। অনেক সময় রাত জেগে থাকার এই তাগিদ আসলে বলে দেয়, সারাদিনে নিজের জন্য একটু থামার, নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুই নেই। সেই সময়টা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে নয়, বরং দিনের মধ্যেই ফিরিয়ে আনুন।
