একসময় শহর মানেই ছিল উন্নত জীবন, ভালো চিকিৎসা, উন্নত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আধুনিক নগরজীবনের এই সুবিধার আড়ালেই নীরবে বাড়ছে আরেকটি বড় স্বাস্থ্য সংকট- টাইপ-২ ডায়াবেটিস। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ মানুষের জীবনযাত্রাকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।
ভারতকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম ‘ডায়াবেটিস হটস্পট’ বলা হয়। উদ্বেগের বিষয়, শুধু প্রবীণ নয়, এখন ২০ ও ৩০-এর কোঠার তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে এই রোগের প্রকোপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে শহুরে জীবনযাত্রার।
আধুনিক শহুরে জীবন যেমন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে, তেমনই কমিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং দূষিত পরিবেশ, যা ডায়াবেটিসের আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করছে।
আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ছবি: সংগৃহীত
কেন শহুরে জীবনে বাড়ছে ডায়াবেটিস?
অলস জীবনযাপন
অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ, যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো এবং মোবাইল-কম্পিউটারের সামনে অতিরিক্ত সময় কাটানো এখন শহুরে জীবনের অংশ। ফলে শরীরচর্চা কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে।
ফাস্ট ফুডের বাড়বাড়ন্ত
ব্যস্ত জীবনে অনেকেই বাড়ির খাবারের বদলে ভরসা করছেন ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত খাবার, ঠান্ডা পানীয় ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর। এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, নুন ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকলেও পুষ্টিগুণ ও ফাইবারের পরিমাণ কম। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস স্থূলতা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
মানসিক চাপ ও কম ঘুম
কাজের চাপ, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, যানজট এবং অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ায়। এর ফলে রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট হয়, খিদে বেড়ে যায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও একইভাবে ক্ষতিকর।
বায়ুদূষণও দায়ী হতে পারে
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকলে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। ফলে দ্রুত নগরায়ণে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
ভারত এখন 'ডায়াবেটিস ক্যাপিটাল'! ছবি: সংগৃহীত
তরুণদের মধ্যেও কেন বাড়ছে এই রোগ?
একসময় ডায়াবেটিসকে বয়স্কদের রোগ মনে করা হলেও এখন কম বয়সিদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস। এর প্রধান কারণগুলো হল শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডায়াবেটিস অনেক সময় কোনও স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। ফলে হৃদ্রোগ, কিডনির জটিলতা, স্নায়ুর ক্ষতি বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দেওয়ার পর অনেকের রোগ ধরা পড়ে।
কীভাবে কমাবেন ঝুঁকি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সহজ অভ্যাস ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করুন, প্রতিদিন শাকসবজি, ফল, দানা শস্য, ডাল ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন খান। মিষ্টি, ঠান্ডা পানীয় এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন, প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান এবং যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
হাঁটলেই থাকবেন ফিট। ছবি: সংগৃহীত
নিয়মিত পরীক্ষা করান
যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, ওজন বেশি বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁদের নিয়মিত রক্তে শর্করার পরীক্ষা করানো উচিত। কারণ, রোগ যত দ্রুত ধরা পড়বে, তত সহজে চিকিৎসা শুরু করা যাবে এবং হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, চোখ ও স্নায়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে জটিলতার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, নগরায়ণ থামবে না, কিন্তু জীবনযাত্রায় ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। উন্নত শহুরে জীবনের সুবিধা উপভোগ করতে হলে নিজের স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
