মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী। রাঢ়বঙ্গের বাঁকুড়ায় এই তিথি মানেই গোটাষষ্ঠী। দেবীর ব্রত, লোকবিশ্বাস আর খাদ্যসংস্কৃতির মেলবন্ধনে এই দিনটির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। তার আঁচ পড়ে আগের দিন থেকেই। শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শহরের মাছবাজার থেকে গ্রামসংলগ্ন হাট - সর্বত্র শুরু হয়ে যায় পান্তা-রুইয়ের প্রস্তুতি। শীতল আহার আর টক-ঝাল স্বাদের টানে বাজারমুখী গৃহস্থ। শুক্রবার সকাল থেকেই বাঁকুড়া শহরের মাচানতলা মাছবাজার, লালবাজার ও বিষ্ণুপুর রোড সংলগ্ন এলাকায় ছিল উপচে পড়া ভিড়। বরফের উপর সাজানো রুই, কাতলা, মৃগেল থাকলেও নজর ছিল মূলত রুই মাছের দিকে। হাতে পাঁজি, মুখে তাড়া - “আজই ভালো রুই চাই” - এই দাবিই শোনা গিয়েছে ক্রেতাদের মুখে মুখে। মাছ বিক্রেতাদের দাবি, বছরের অন্য দিনের তুলনায় গোটাষষ্ঠীর সময় রুইয়ের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে দেড় থেকে দু’কেজি ওজনের রুই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।
চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে দামও। আগের সাধারণ দিনে মাঝারি রুই কেজি প্রতি ২৫০–২৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হতো, কিন্তু গোটাষষ্ঠীর আগের দিন বড় সাইজের দেশি রুই কেজি প্রতি ৩৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ক্রেতারা জানান, দু’দিন আগেও যে মাছ ২৫০–২৮০ টাকায় মিলত, আজ সেই একই মাছ ৩০০ টাকারও বেশি দরে কিনতে হচ্ছে। মাচানতলার এক বিক্রেতা বললেন, “গোটাষষ্ঠীতে রুই ছাড়া বাজার চলে না। ভোরে যে মাছ এনেছি, বেলা বাড়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। দাম কিছুটা বেশি হলেও ক্রেতারা অপেক্ষা না করেই কিনে নিচ্ছেন।”
শুধু শহর নয়, আশপাশের গ্রাম থেকেও বহু মানুষ এদিন ভোরে বাজারে আসেন। কারও ঝুড়িতে পান্তাভাতের চাল, কারও হাতে শাকসব্জির ব্যাগ - সবকিছুর মাঝখানে অনিবার্য অনুষঙ্গ রুই মাছ। লালবাজার এলাকার বাসিন্দা শিবু দাস বলেন, “গোটাষষ্ঠীতে পান্তাভাতের সঙ্গে রুই না হলে চলেই না। বড় পেটি রুই হলে ঝোলের স্বাদ আলাদা হয়।” তাঁর স্ত্রী মীনাক্ষী দাস যোগ করেন, “ঝাল রাখতে হয় পরিমিত, বেশি হলে অম্বলের সমস্যা হয়।” মাছের পাশাপাশি বেড়েছে সব্জির চাহিদাও। কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ, লেবু, শাকপাতা ও শীতের সব্জিতে জমজমাট ছিল বাজার। কাঁচালঙ্কার ঝুড়ির সামনে ভিড় চোখে পড়ার মতো। সবজি বিক্রেতা হরেন মাহাতো জানান, “গোটাষষ্ঠীর আগের দিন কাঁচালঙ্কা ও পিঁয়াজের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ। ক্রেতারা খাঁটি সরষের তেল চাইছেন। পান্তাভাতের স্বাদ তার ছাড়া অসম্পূর্ণ।” গ্রামবাংলার হাটেও একই ছবি। ওন্দা ও সংলগ্ন এলাকায় সাপ্তাহিক হাটে দুপুরের দিকে ভিড় আরও বাড়ে। রুই কিনে ফেরার পথে গোটাষষ্ঠীর গল্পে মেতে ওঠেন মানুষ। অনেকের মতে, পান্তাভাতের আসল স্বাদ টক-ঝালে। অম্বল হলে ঘোল খাওয়ার রেওয়াজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
গোটাষষ্ঠী কেবল খাদ্যাভ্যাসের উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঁকুড়ার বিশেষ লৌকিক আচারও। জেলার বহু গ্রামে এদিন শিল-নোড়াকে ষষ্ঠী ঠাকুর রূপে পুজো করা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ষষ্ঠী ঠাকুর সন্তানের মঙ্গলরক্ষক। শীতল আহার শরীর শান্ত রাখে এবং সন্তানের মঙ্গল সাধন করে - এই বিশ্বাসেই এদিন অতিরিক্ত মশলা বারণ। ঝাল থাকে, তবে সীমার মধ্যে। বাঁকুড়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক সৌমেন রক্ষিত জানান, শিলষষ্ঠী বা গোটাষষ্ঠী রাঢ়বঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ লৌকিক আচার। আধুনিকতার ভিড়েও এই উৎসবের মাধ্যমে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও বিশ্বাস এখনও টিকে রয়েছে। বাজারের ভিড় থেকে ঘরের পুজো - সবমিলিয়ে গোটাষষ্ঠী বাঁকুড়ার জীবনে শুধুই একটি তিথি নয়, বরং স্বাদ, বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের যৌথ উৎসব।
