২০১৯ সালে বিধানসভা ভোটের পর বিজেপি-শিবসেনার জোটে ভাঙন এবং পরবর্তী কালে কংগ্রেস এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে উদ্ধব ঠাকরের সরকার গঠন দিয়ে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে যে নয়া সমীকরণের সূচনা হয়েছিল, তার একটি পর্বের সমাপ্তি হল শুক্রবার। বৃহন্মুম্বই পুরসভার ভোটের ফলাফল (BMC Election Results 2026) প্রকাশ্যে আসার পর। ঠাকরে পরিবারের প্রভাব কমিয়ে মুম্বই তো বটেই, গোটা মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন চাণক্য হিসাবে আবির্ভূত হলেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। তাঁর নেতৃত্বে লড়া বিজেপির মেয়র প্রথমবার মেয়র পেতে চলেছে দেশের বৃহত্তম (জনসংখ্যার নিরিখে) এবং ধনীতম মুম্বই পুরসভা। অন্য দিকে, কার্যত ধরাশায়ী হয়েছে বিজেপিরই জোটসঙ্গী একনাথ শিণ্ডের শিবসেনা। উপমুখ্যমন্ত্রী শিণ্ডের এই সর্বনাশে 'পৌষ মাস' উদ্ধবের! নির্বাচনে হারার পরেও। মুম্বইয়ে দাপট কমার পরেও।
গত সাত বছরে অনেক ঘটনাপ্রবাহ দেখেছে মহারাষ্ট্রের রাজনীতি। উদ্ধবের শিবসেনা ভেঙে বেরিয়ে গিয়েছে শিণ্ডের নেতৃত্বাধীন একটি অংশ। তাঁরা বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। ভেঙেছে শরদের এনসিপি-ও। ভাই অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বে অংশ বিজেপির সঙ্গে জোট করেছে। শিণ্ডের সেনা, অজিতের এনসিপি এবং বিজেপি মিলে মহারাষ্ট্রে সরকারও গড়েছে সম্প্রতি। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন ফড়নবিশ। শিণ্ডে এবং অজিত উপমুখ্যমন্ত্রী। এই তিন নেতার নেতৃত্বাধীন মহাজোট গত লোকসভা ভোটেও ভালো ফল করেছিল। কিন্তু পুরভোটে সব জোট ভেঙে গিয়েছে। শাসক ‘মহাজুটি’ কিংবা বিরোধী জোট ‘মহাবিকাশ আঘাড়ি’র শরিক দলগুলির মধ্যে সর্বাত্মক কোনও সমঝোতা হয়নি মুম্বই-সহ কোনও পুরসভাতেই।
বিজেপি ও শিণ্ডেসেনার জোটের সম্মুখসমরে ছিল উদ্ধবের শিবসেনা (ইউবিটি), রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার এবং শরদ পওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি(এসপি) জোট। অন্য দিকে, কংগ্রেস এবার সমঝোতা করেছে দলিত নেতা প্রকাশ আম্বেদকরের দল ‘বঞ্চিত বহুজন আঘাড়ি’(ভিবিএ)-র সঙ্গে। অন্য দিকে, অজিতের বিজেপি-শিণ্ডেসেনা জোটে ঠাঁই না পেয়ে একক ভাবে লড়েছে। শুক্রবার ভোটের ফলাফলে (এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার সময়) দেখা গেল, ২২৭ ওয়ার্ডের মধ্যে ১১৫ ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি-শিণ্ডেসেনার জোট। ২০ বছর পরে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে ‘ঠাকরে-সাম্রাজ্য’ রক্ষায় ভোটের আগে হাত মিলিয়েছেন উদ্ধব ও রাজ। কিন্তু বিফল হতে চলেছেন প্রয়াত বালাসাহেব ঠাকরের পুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্র। উদ্ধবসেনা এগিয়ে রয়েছে ৭২ আসনে। রাজের এমএনএস ৮ আসনে।
মুম্বইয়ের ভোটে যাঁরা জিতলেন ---
দেবেন্দ্র ফড়নবিশ
মুম্বইয়ের পুরভোটের সবচেয়ে লাভবান হলেন দেবেন্দ্র। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তাঁর নেতৃত্বে মুম্বই পুরসভা দখলের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করে ফেলেছিল বিজেপি। সেই মতো একেবারে ওয়ার্ড ধরে ধরে উন্নয়নে জোর দিয়েছিলেন দেবেন্দ্র। রাস্তা, নিকাশি ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রার্থী হিসাবেও এমন নেতাদেরই বাছাই করা হয়েছিল, যাঁদের এলাকায় প্রভাব রয়েছে। সুনাম রয়েছে। এতে যে সব জায়গায় শিবসেনার দাপট কম, মূলত সেই জায়গাগুলির ভোটারেরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
উদ্ধব ঠাকরে
গত পুরভোটে উদ্ধবের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা ৮৪ আসনে জিতে পুরসভা দখল করেছিল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে উদ্ধবদের আসন অনেকটাই কমেছে। তার পরেও এক অর্থে লাভই হয়েছে বালাসাহেবের পুত্রের। কারণ, মুম্বইবাসী যে এখনও শিণ্ডের তুলনায় তাঁকেই শিবসেনার সর্বময় নেতা বলে মানেন, তা আরও একবার প্রমাণিত হল। যেখানে যেখানে ঠাকরেদের ভিত শক্ত, সেই উদ্ধবসেনার প্রার্থীরাই জিতেছেন। এতে শিণ্ডের প্রভাব কমার সম্ভাবনা রয়েছে ভবিষ্যতে।
যাঁরা হারলেন---
একনাথ শিণ্ডে
শিবসেনায় ভাঙনের পর উদ্ধবের সঙ্গ ছেড়ে শিণ্ডের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন ৮৪ জন কাউন্সিলর। তার পরেও ২৭ আসনে (প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময়) এগিয়ে রয়েছে শিণ্ডে সেনা। ভোটের প্রচারে নিজের গোষ্ঠীকেই আসল শিবসেনা বলে দাবি করে ঠাকরেদের দীর্ঘদিনের ভোটব্যাঙ্ক নিজের দিকে টানতে চেয়েছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রী শিণ্ডে। তার ওই কৌশল যে সফল নয়, তা-ই স্পষ্ট হল ভোটের ফলে।
শরদ এবং অজিত পাওয়ার
শরদের এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি বেশি মূলত গ্রামীণ এলাকায়। বরাবরই তা-ই ছিল। এবার শহরাঞ্চলেও ছাপ ফেলার সুযোগ ছিল শরদের কাছে। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হলেন প্রবীণ নেতা। ব্যর্থ অজিতের নেতৃত্বাধীন এনসিপি-ও। অজিত একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই ভোটে। তাঁর লক্ষ্য ছিল, দলের ভোটব্যাঙ্ক বাড়ানো। কিন্তু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা বাদে সেই অর্থে কোথাও দাপট দেখাতে পারলেন না অজিতেরা।
