সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: জল থইথই স্বাধীনতা দিবস। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশপ্রেমের জোয়ার। একদিকে গলা জলে উঠছে তেরঙ্গা, অন্যদিকে তেরঙ্গা থিমে প্রোফাইল পিকচার বদলের হিড়িক। কোথাও আবার সমালোচনার কাঁটা। আজাদি ঝুটা না হোক, বৃথা প্রমাণ করতে সবরকম চেষ্টা। মোটামুটি এই ঘূর্ণিতে পাক খেল স্বাধীনতার সত্তর বছর পূর্তি।
প্রোফাইলে প্রোফাইলে একে একে ভেসে আসছে ছবিগুলি। প্রচারের মঞ্চ সোশ্যাল মিডিয়া। যে ভারচুয়াল দুনিয়া চোদ্দ আগস্ট রাত পড়তে না পড়তেই তেরঙ্গায় রেঙে উঠেছে। একে একে ছড়িয়ে পড়ছে দেশপ্রেমের বার্তা। সমানভাবে থাকছে নিন্দার জুজুও। সেখানেই রাত পোহাতে দেখা গেল গলা জলে স্বাধীনতা উদযাপনের ছবি। কোনটা দেশভক্তি। এক গলা জলে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা উদযাপনের এ ছবি? নাকি সমালোচনার কাঁটাগুলো? নাকি নিছক প্রশংসার গদগদ ভক্তি-স্তুতি-স্তব! এ প্রশ্নের মীমাংসা না পেয়েই বোধহয় ছুটির দিনে ভাতঘুমে গেলেন নেটিজেনরা।
ঠিক যে সময় স্বাধীনতা দিবস এল, তখন বন্যায় ভাসছে দেশের বেশিরভাগ অংশ। উত্তর-পূর্ব ভারত কার্যত বিছিন্ন। বন্ধ ট্রেন চলাচল। অসম ভেসে যাচ্ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। সেই অসমের ধুবড়িরই ছবি দেশবাসীর চোখে জল এনে দিল। দেখা যাচ্ছে, প্রায় গলা বা কোমর সমান জলে দাঁড়িয়েও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন সেখানকার অধিবাসীরা। শামিল খুদেরাও। শুধু ধুবড়ি নয়, অসমের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তুলে ধরছেন এ বাস্তবতা। দেখিয়ে দিয়েছেন, বন্যাত্রাণ নিয়ে যত রাজনীতিই হোক, যত কার্পণ্য, বিলম্ব, চাপানউতোরই থাকুক না কেন, তাতে তাঁদের দেশভক্তি বিন্দুমাত্র টাল খায়নি। খাওয়ার কথাও নয়। কেননা দেশ মানে রাজনীতি নয়, নেতা-মন্ত্রী নয়, এমনকী তত্ত্বের ভারী প্রবন্ধও নয়। দেশ মানে এই ভালবাসাটুকুই। যা কোনও বিনিময় প্রত্যাশা করে না। বিহার, মধ্যপ্রদেশের ছবিও যেন সে কথাই বলছে।
এ যদি দেশভক্তি না হয় তবে আর কী! এহেন ক্যাপশনেরই ছড়াছড়ি ভারচুয়াল দুনিয়ায়। যে দেশে আজও অক্সিজেনের অভাবে ষাটেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়, যে দেশে আজও রাতবিরেতে একলা মহিলাকে ধাওয়া করে নেতাপুত্র, সেখানে স্বাধীনতার মানে আসলে কী! এ প্রশ্নে চোদ্দর রাত থেকেই তোলপাড় হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। দেশভক্তি, দেশপ্রেমের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস, রাজনীতি, আখের গোছানো, স্বাধীনতা সংগ্রাম, নেহরু-সুভাষ, গান্ধী সব ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়ছে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে। এত ঠাসাঠাসি যে দমবন্ধ এ পৃথিবীতে সামান্য নিখাদ ভালবাসার অক্সিজেনটুকু মেলা যেন ভার। যে ভালবাসায় সকল দেশের সেরা না হলেও, রানির মতো ধনরতন না থাকলেও রবি ঠাকুর বলেছিলেন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে। তারই যেন একান্ত অভাব কৃত্রিম এ দুনিয়াতে। এককালে, কারা যেন আওয়াজ তুলেছিলেন এ আজাদি ঝুটা হ্যায়। সাত দশক পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবার সে কথাই তুলছেন নেটিজেনরা। তবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের এই প্রবণতাকে বেশ ভালই চিহ্নিত করেছেন সুরকার জয় সরকার। তিনি লিখেছেন, ‘আজ ফেসবুকে সারাদিন মূলতঃ দু’ধরণের স্ট্যাটাস আপডেট দেখা যাবে …
১। একদল উথলে ওঠা দেশপ্রেম প্রকাশ করবেন (আর সারাবছর ধরে আখের গোছাবেন)।
২। একদল নানাধরণের sarcastic মন্তব্য করে নিজেদের প্রবল প্রগ্রেসিভ হিসেবে প্রমাণ করবার চেষ্টা করবেন (আর সারাবছর ধরে আখের গোছাবেন)
অনুরোধ : যদি এর মাঝে একটু সময় পাওয়া যায় দেশের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে কোনওভাবে সাহায্য করা যায় কি না ভেবে দেখতে পারেন।’
সারকথা বোধহয় এটাই। দশচক্রে ভগবানও যেখানে ভূত, সেখানে পাকেচক্রে স্বাধীনতা নিয়েও নানা তত্ত্বের কচকচি। ওদিকে আবার কর্পোরেটের দৌলতে ইন্ডিপেন্ডেন্স ফেস্টিভ্যালের তোড়জোড় । তেরঙ্গা আবেগে ডিসকাউন্টের ফায়দা জুড়ে চলছে নানারকম ব্যবসা। কিন্তু এসব পেরিয়ে নিজের দায়িত্বটুকু বুঝে উঠতে পারাই বোধহয় আজ লেখা থাকছে দিকে দিকে উড্ডিন তেরঙ্গাতে। আমরা সে লেখা পড়তে পারছি তো?
ছবি সৌজন্য- ফেসবুক ও টুইটার
The post জল থইথই স্বাধীনতা দিবস, দেশপ্রেমে ভাসছে সোশ্যাল মিডিয়া appeared first on Sangbad Pratidin.
