সম্পর্কের শৈত্য কাটছে ভারত-চিনের! ফের বাণিজ্যের জন্য খুলছে নাথু-লা। সেই বিষয়ে সীমান্ত অঞ্চলে প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রত্যাশা নিয়ে ২০০৬ সালের ৬ জুলাই এই প্রাচীন সিল্ক রুট দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়েছিল। সিকিমের এই সিল্ক রুট লাসা থেকে চুম্বি উপত্যকা ও নাথু-লা গিরিপথের মধ্য দিয়ে তাম্রলিপ্ত বন্দর অর্থাৎ অধুনা তমলুকে শেষ হয়েছে। এই পথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য ভারত ইতিমধ্যে সড়ক ও রেল পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেভক-রংপো রেল প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। ভবিষ্যতে এই রেলপথটি নাথু-লা পাস পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে 'রংলি-মেনলা' সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে।
জানা গিয়েছে, হিমালয় অঞ্চলে ভারত-চিন দুটি সীমান্ত বাণিজ্য পথের মধ্যে নাথু-লা একটি। দ্বিতীয় পথটি হল উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস। নাথু-লা গিরিপথ দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্য প্রতি বছর মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ছয় মাস চালু থাকে। ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় এই পথে বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এরপর ২০০৬ সালের ৬ জুলাই ফের চালু হলেও কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এই গিরিপথে বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল প্রায় ৬০০ ভারতীয় ব্যবসায়ী সংস্থা এবং সিকিমের বিপুল সংখ্যক পরিবহন কর্মীদের জীবিকা। এই পথেই তিব্বত থেকে ভারতে আসে কাঁচা রেশম, পশম, ইয়াকের লোম এবং মাটির তৈরি সামগ্রী।
জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ পর্যায়ের আলোচনা হয়। তিনটি নির্দিষ্ট গিরিপথ—সিকিমের নাথু-লা, হিমাচল প্রদেশের শিপকি-লা এবং উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সমঝোতাও হয়! এরপর কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং পরিকাঠামোগত বিষয়ে আলোচনার জন্য ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই চিন সফরে গিয়েছিলেন। ওই দেশের উপমন্ত্রী সান হাইয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। কার্যত এরপরই চিন সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়।
৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেবক-রংপো রেল প্রকল্পের কাজ জোরদার করা হয়। বাণিজ্যিক কারণে নাথু-লা পর্যন্ত এই রেলপথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে রংপো-গ্যাংটক অংশের জন্য 'ফাইনাল লোকেশন সার্ভে'-র কাজ শেষ হয়েছে। এখন সিকিমের গ্যাংটকের সঙ্গে নাথু-লাকে রেলপথে জুড়তে একই ধরনের সার্ভে চলছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে। পূর্ব সিকিমের রংলি বাজার থেকে ভারত-তিব্বত সীমান্তের কাছে মেনলা পর্যন্ত ওই সড়ক যাবে। 'ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড' প্রকল্পের কাজ করছে। ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের বিকল্প হিসেবে জাতীয় সড়ক ৭১৭-এ নির্মাণের কাজও চলছে। কারণ, ভূমিধসের সমস্যার জন্য ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায়ই বন্ধ থাকে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে, কেন্দ্রীয় সরকার ওই জাতীয় সড়ক প্রশস্ত ও উন্নত করার জন্য ৭৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। জানা গিয়েছে, চিন সীমান্ত পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার জন্য এই পদক্ষেপ। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ২০১৬ সালে নাথু-লা পথে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮২.৬৮ কোটি টাকা। ডোকলাম অচলাবস্থার কারণে ২০১৭ সালে বাণিজ্যের পরিমাণ কমে ৮.৮৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০১৮ সালে বাণিজ্য কিছুটা বেড়ে ৪৮.২৮ কোটি টাকায় পৌঁছলেও ২০১৯ সালে কমে ৪৩.৫১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। প্রশাসনের এক কর্তা জানান, ভারত ও চিনের মধ্যে সামগ্রিক বাণিজ্যের তুল্যমূল্য বিচারে এই সংখ্যা খুবই সামান্য। ২০২৫-২০২৬ সালে ভারত চিন থেকে ১৩২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। দুই দেশের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫১.১ বিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।কূটনৈতিক কারণ ও স্থানীয় পর্যায়ে এর গুরুত্ব অনেক বেশি বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
