মহিলাদের পোশাক, শরীর, জীবনযাত্রা নিয়ে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব, তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করার অদম্য চেষ্টার নজির সমাজে আগেও ছিল। এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সেভাবে চোখে না পড়লেও এই ব্যাধি চিরন্তন এখনও সমাজ-ব্যবস্থাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। দেশ যতই উদারপন্থী এবং যুগান্তকারী আইন প্রণীত হোক না কেন, এই দিক দিয়ে বিচার করলে লিঙ্গবৈষম্য এখনও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত বলে মন্তব্য করেছে স্বয়ং দেশের শীর্ষ আদালতই।
সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং এন কোটিশ্বর সিং জানিয়েছেন, সাংবিধানিক রক্ষাকবচ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের স্থিতিশীলতা সত্ত্বেও বিষয়টি ভীষণ রকম প্রাসঙ্গিক এবং বাস্তব। তাঁদের কথায়, “প্রতিদিন মহিলাদের প্রতি পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয় মেলে।" তাঁদের প্রশ্ন, "কেন মহিলাদের শরীর, জীবনযাত্রা, সর্বোপরি 'চয়েস' নিয়ে এত পিতৃতান্ত্রিক আচরণ?"
যে মামলার সূত্র ধরে শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ, তার মূলে রয়েছে স্ত্রীকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির আবেদন। ২০১১ সালে স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ওই ব্যক্তি। তাঁর যাবজ্জীবনের সাজা বহাল রাখতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলে, এই ঘটনার নেপথ্যে ছিল গার্হস্থ্য হিংসার নির্মমতা। পণ চেয়ে নিত্য অত্যাচারের শিকার হতেন ওই ব্যক্তির স্ত্রী। তাঁকে নিগ্রহ করা হত, মারধরের সঙ্গে জুটত গালিগালাজ। তারপর একদিন পুড়ে মৃত্যু হয় তাঁর। ঘটনার সূত্র ধরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেঞ্চের মন্তব্য, "দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ এখনও মহিলাদের প্রতি পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের দৃষ্টান্ত বেড়েই চলেছে। কোনও ইতি নেই। এখনও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। সাংবিধানিক মতাদর্শ এবং জ্বলন্ত বাস্তবের মধ্যের তফাতটুকু রয়েই যাচ্ছে।"
তথ্য দিয়ে শীর্ষ আদালত আরও জানিয়েছে, সমাজে মহিলাদের প্রতি হিংসার ঘটনা বেড়েই চলেছে। ২০২৩ সালেই মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের নথিভুক্ত ঘটনা ছিল ৪৪৮,০০০-র বেশি। আর বছরে পণ চেয়ে মহিলাদের নির্যাতনের ঘটনা এখনও থাকে ৬,০০০-এর বেশি। সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই তথ্য-পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা মহিলাদের প্রতি পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের এখনও সে অর্থে কোনও বদল হয়নি।
