পুজো প্রায় এসেই গেল৷ পাড়ায় পাড়ায় পুজোর বাদ্যি বেজে গিয়েছে৷ সেরা পুজোর লড়াইয়ে এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়৷ এমনই কিছু বাছাই করা সেরা পুজোর প্রস্তুতির সুলুকসন্ধান নিয়ে হাজির Sangbadpratidin.in৷ পড়ুন ৬৪ পল্লি সর্বজনীনের পুজো প্রস্তুতি৷
শুভময় মণ্ডল: সভ্যতার জন্ম দিয়েছে যে, এখন তারই সৃজনশীলতা বড় প্রশ্নের মুখে। কথা হচ্ছে মানুষের। সভ্যতার ইতিহাসে যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা সবই এই মানুষের দান। তাঁর সৃজনীশক্তি নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। সভ্যতার আদি থেকে যদি শুরু করা যায়, তাহলে দেখা যাবে আগুন, চাকা, লোহা, কৃষিকাজের মতো মহান আবিষ্কার হোমো সেপিয়েন্সের হাত ধরে। সৃষ্টির শুরুতে আর পাঁচটা জন্তুর মতোই চলনে-স্বভাবের প্রাণী মানুষ যখন চার পেয়ে থেকে দু’পেয়ে হল, তার বুদ্ধির বিকাশ হল। তারপরই সভ্য হওয়ার নিরন্তর চেষ্টায় ব্রতী হল।
কিন্তু কালের নিয়মে আবিষ্কারের মহাযজ্ঞে শামিল হয়ে ধীরে ধীরে বুদ্ধি-শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠল মানুষ। তখনই ষড়রিপুর মারণথাবায় পারস্পরিক রেষারেষিতে চলে গেল। তখনই সৃজনশীল মানুষ যন্ত্রে পরিণত হল। হারাল তার নান্দনিকতা। মানুষ তাই বর্তমানে যান্ত্রিক। বড়ই ক্লান্ত। সৃষ্টির এই খেলা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই টাইম ট্রাভেলে ফের সভ্যতার আদিলগ্নে ফিরে গেলে কেমন হয়? কেমন ছিল সৃষ্টির ইতিহাস, তাই এবার ঘেঁটে দেখতে চলেছে ৬৪ পল্লি সর্বজনীন। মানব সভ্যতার বিকাশের সেই ক্রমপর্যায়কে এবার থিম ভাবনায় তুলে আনছে দক্ষিণের এই নামী পুজো। এবছর তাদের পুজো ৬৯তম বর্ষে পা দিয়েছে। থিমের পোশাকি নাম- অযান্ত্রিক।
থিমমেকার শিল্পী রূপক বসুর হাতে সেজে উঠছে গোটা মণ্ডপ। সভ্যতার একালের যান্ত্রিক মানুষকে ফের সেকালে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন তিনি। যেখানে সে অযান্ত্রিক। গোটা মণ্ডপে সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে মানুষের প্রত্যেকটি যুগান্তকারী সৃষ্টিকে তুলে ধরা হচ্ছে। আগুন, চাকা, লোহা, কৃষিকাজের মতো প্রত্যেকটি আবিষ্কারকেই তিনি মণ্ডপসজ্জায় তুলে ধরছেন। আসামের এক বিশেষ লম্বা ও ঋজু বাঁশ ব্যবহার করা হচ্ছে মণ্ডপে। তার সঙ্গে কয়লায় মানুষের মুখ খোদাই করে আদিম যুগকে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, প্রাচীন সময় থেকেই মানুষ যতই সৃজনশীল হোক না কেন, ঈশ্বরবিশ্বাস তার মধ্যে বরাবরই ছিল। ভক্তি হোক বা ভয় থেকে, আদিমকাল থেকেই দেবদেবীর উপর অগাধ বিশ্বাস ছিল মানুষের। তাই বিভিন্ন সভ্যতায় আরাধ্য দেবদেবীর রূপ-আকারে বেশ কিছু সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। যেমন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় আরাধ্য দেবী ইনকির সঙ্গে দেবী দুর্গার অনেকটা মিল পাওয়া যায়। সেইভাবেই মানব সভ্যতার বিকাশ যেমন হয়েছে তেমনই ঈশ্বরে বিশ্বাস ততই বেড়েছে মানুষের। সেই থেকে কোনও ধর্মের অবলম্বন আর বাকিটা ইতিহাস। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সময় এগিয়েছে, মানুষ আরও সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মেতেছে। কিন্তু এভাবেই সে যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। মানুষ আরও নিঃসঙ্গ হয়েছে। বেড়েছে পারস্পরিক দ্বেষ, হানাহানি, হিংসা। মানুষে মানুষে ভালবাসাটাই উধাও। তাই সবার আগে মানুষকে ভালবাসতে হবে, তাকে অযান্ত্রিক করতে হবে। তবেই অক্ষুন্ন থাকবে তার নান্দনিকতা, নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে মানব সভ্যতা।
গোটা মণ্ডপ জুড়েই বেশ কিছু ভাস্কর্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে। থাকবে মায়া সভ্যতার সেই ক্যালেন্ডার, মেসোপটেমিয়ার ইনকি দেবীর প্রতিকৃতি। থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই প্রতিমা গড়ছেন শিল্পী অরুণ পাল। আলোর দায়িত্ব রয়েছেন শিল্পী বিকাশ বড়াল। থিম সংগীত লিখেছেন রাজীব চক্রবর্তী ও তাতে সুর দিয়েছেন আশু চক্রবর্তী। থিম সংগীত গেয়েছেন শিল্পী জয়তী চক্রবর্তী। গত বছর শিল্পী শিবশংকর দাসের ভাবনায় অ্যালুমিনিয়ামের পুনর্ব্যবহার মণ্ডপসজ্জায় ফুটে উঠেছিল। এবছরের ভাবনা পুজোপ্রেমীদের কতটা মনে ধরে তাই এখন দেখার।
কেমন চলছে পুজোর প্রস্তুতি, দেখুন ভিডিওয়-
The post কালের চাকায় সওয়ার হয়ে অযান্ত্রিক মানুষের কাহিনি এবার ৬৪ পল্লির পুজোয় appeared first on Sangbad Pratidin.
