হাতে গোনা আর চার-সাড়ে চার মাসের অপেক্ষা। তারপরই বাঙালির সব থেকে বড় উৎসব দুর্গাপুজো। ফি বছর কলকাতার কুমোরপাড়া কুমোরটুলিতে মে মাসের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। এবারও ব্যস্ততা চলছিল। কিন্তু কোথাও যেন তাল কেটেছে। এই মুহূর্তে কুমোরটুলিতে শিল্পীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। প্রতিমা তৈরির এঁটেল মাটিতে টান পড়েছে! মাটি আসছে না বেশ কিছু দিন ধরেই। শোনা যাচ্ছে, প্রতি বছর উলুবেড়িয়া, কাকদ্বীপ-সহ অন্যান্য এলাকা থেকে মাটি আসে কুমোরটুলিতে। ওই মাটি দিয়ে হাজারে হাজারে দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয় কুমোরটুলিতে। নির্দিষ্ট সময়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মা দুর্গা মণ্ডপে যান। কিন্তু এবার হঠাৎ করেই যেন আঁধার, আশঙ্কা নেমে এসেছে কুমোরটুলিতে। কিন্তু কেন আসছে না মাটি? রাজ্যে পালাবদলে নতুন সরকার তৈরি হয়েছে। সেজন্য বহু জায়গাতেই বেআইনিভাবে মাটি কাটার কাজ বন্ধ। প্রশাসন কড়া নজরদারিও চালাচ্ছে। সেকারণেই মাটি সঙ্কটে পড়েছে কুমোরটুলি।
কলকাতা ও আশপাশের এলাকার বহু পুজো কমিটি কয়েক দশক ধরে কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা নিয়ে যায়। অনেক আগে থেকে বায়নাও হয়ে যায়। জানুয়ারি মাস থেকে শিল্পীদের ঘরে প্রতিমা তৈরির কাজও চলে। গত কয়েক বছরে দুর্গাপুজোর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে বলে খবর। প্রতিমা তৈরির চাপও থাকে কুমোরটুলিতে। কেবল কলকাতার শিল্পীরাই নয়, জেলা থেকেও বহু শিল্পী এই কয়েক মাস কাজ করতে কুমোরটুলিতে আসেন। সকাল থেকেই কেউ ব্যস্ত থাকেন মাটি মাখতে। কেউ আবার প্রতিমার গায়ে মাটির প্রলেপ দেন। বর্ষার আগেই অনেকটা কাজ এগিয়ে রাখেন বহু শিল্পী। টার্গেট অনুযায়ী কাজও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ করেই এবার মাটি আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় শিল্পীরা।
কাজের ফাঁকে জিরিয়ে নেওয়া। ছবি- ব্রতীন কুণ্ডূ।
শিল্পীরা জানাচ্ছেন, জেলার বহু এলাকা থেকে মাটি আসে। এবারও আসছিল। কুমোরটুলিতেও অবৈধভাবে কাটা মাটি আসে প্রতিমা তৈরির জন্য, সেকথা স্বীকার করেছেন শিল্পীরা। নতুন সরকার আসার পর বেআইনিভাবে মাটি কাটার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে এঁটেল মাটি কুমোরটুলিতে আসা কার্যত এই মুহূর্তে বন্ধ। মাটি যদি সময়ে না আসে তাহলে কী হবে? সেই আশঙ্কা ছড়িয়েছে। পরিমাণমতো মাটি না এলেও সমস্যা। কারণ, মাটির অভাবে প্রতিমার কাজ শেষ হবে না! শিল্পী সুবল পাল বলেছেন, "এই মাটি না এলে কোনওভাবেই পুজো কমিটির হাতে প্রতিমা তুলে দিতে পারব না।" শিল্পী নবকুমার পাল আবার সময় বেঁধে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ৭-১০ দিনের মধ্যে মাটির সমস্যা না কাটলে প্রবল সমস্যা দেখা দেবে। প্রতিমা ঠিক সময়ে মণ্ডপে পাঠানো যাবে না।
বড় শিল্পীদের ঘরে মাটি মজুত থাকে। সেই মাটিতে প্রতিমা তৈরির কাজ হয়। তবে সেই মাটিতেও টান দেখা দিয়েছে। এদিকে ছোট শিল্পীদের অনেকের ঘরেই কাজের জন্য মাটি নেই! অনেক শিল্পীই আবার আর্থিক সমস্যার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
বড় শিল্পীদের ঘরে মাটি মজুত থাকে। সেই মাটিতে প্রতিমা তৈরির কাজ হয়। তবে সেই মাটিতেও টান দেখা দিয়েছে। এদিকে ছোট শিল্পীদের অনেকের ঘরেই কাজের জন্য মাটি নেই! অনেক শিল্পীই আবার আর্থিক সমস্যার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। কারণ, অনেক শিল্পীর ঘরেই বাইরে থেকে কর্মী-শিল্পীরা মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। দৈনিক মজুরিও তাঁদের দিতে হয়। কাজ না থাকলে তাঁরা অন্য জায়গায় কাজের জন্য চলে যেতে পারে! তখন মাটি এলেও প্রতিমা শিল্পী না থাকলে সমস্যা দেখা দেবে। এমনই বলছেন অনেকে। কর্মীদের ধরে রাখতে পকেট থেকে টাকাও গুণতে হচ্ছে অনেককে। আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন অনেকে।
কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংস্কৃতি সমিতির যুগ্ম সম্পাদক বাবু পাল জানিয়েছেন, অবিলম্বে মাটি না এলে বড় সমস্যা দেখা দেবে। এই বিষয়ে এলাকার নবনির্বাচিত বিধায়ক পূর্ণিমা চক্রবর্তীর দৃষ্টিও আকর্ষণ করা হয়েছে। শিল্পীরা আশা করছেন, রাজ্য সরকার এই সমস্যার আশু সমাধান করবে। করোনা অতিমারির সময়ও প্রতিমা কীভাবে হবে? পুজো কীভাবে হবে? সেই আশঙ্কার মেঘ দেখা গিয়েছিল। যদিও সেবারও বিধিনিষেধের মধ্যে পুজো হয়েছিল। এবারও বাধা কেটে আশ্বিনের শারদপ্রাতে মহা ধুমধামে দেবীর আরাধনা হবে। এমনই মনে করছেন শিল্পীরা।
