বহু অনুরোধেও সাড়া দেননি আর জি কর হাসপাতালে ডিউটিরত কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। লিফটে মৃত যুবক অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে আটকে থাকতে দেখে আত্মীয় ও বন্ধুরা ডিউটিতে থাকা পর পর চারজন সিআইএসএফ জওয়ানের কাছে সাহায্য চাইলে গেলে তাঁরা স্পষ্ট বলে দেন, "এটা আমাদের কাজ নয়। আমরা কিছু করতে পারব না।"
পরিজনদের দাবি, যেহেতু সিআইএসএফের ভারী বুট, রাইফেল রয়েছে, তাই তাঁদের বেসমেন্টে ঢোকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। উদ্ধারকাজে কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা লিফটের গর্তে আটকে থাকা যুককে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেননি। অরূপের পরিবারের দাবি, লিফটম্যান, নিরাপত্তারক্ষী, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান, এমনকী, এক পুলিশ আধিকারিকও সাহায্য করেননি। সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজ শুরু হলে অরূপ বেঁচে যেতে পারতেন বলে পরিবারের দাবি। এদিকে, আদালতে সরকারি আইনজীবীর দাবি, লিফটম্যানরা লিফটের বাইরে দাঁড়িয়ে 'ফুর্তি করছিলেন, গান শুনছিলেন।'
এই ঘটনা সম্পর্কে প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ কুণাল ঘোষ বলেন, "অনভিপ্রেত ঘটনা, দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। কোনও অবস্থাতেই বাঞ্ছনীয় নয়। রাজ্য সরকার সব রকম পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনগুলো যাদের দেখভাল করার কথা, কোথায় কী গাফিলতি হয়েছে, সেগুলো তাদের দায়িত্ব নিতে হবে।"
শুক্রবার ভোরে আর জি করের ট্রমাকেয়ার সেন্টারের বেসমেন্টে লিফটের মধ্যে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় নাগেরবাজারের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কোনওমতে প্রাণে বাঁচেন তাঁর স্ত্রী ও শিশুপুত্র। এই ঘটনায় তিন লিফটম্যান মিলন দাস, বিশ্বনাথ দাস, মানস গুহ, দুই নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান ও শুভদীপ দাসকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
শনিবার আর জি করে ফরেনসিকের পদার্থবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা লিফটটি পরীক্ষা করেন। কেন লিফট নিজের মতো ওঠানামা করছিল, কেনই বা সেনসর কাজ করছিল না, তা খতিয়ে দেখা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ লিফট নির্মাতা সংস্থার কর্মীদেরও তলব করছে। সোমবার ফরেনসিকের বায়োলজি বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে যাবেন। এদিকে, এদিন ধৃত পাঁচজনকে শিয়ালদহ আদালতে তোলা হলে দুই নিরাপত্তারক্ষীর জামিনের আবেদন করেন তাঁদের আইনজীবী জানান, তাঁদের এই ঘটনার সঙ্গে কোনও যোগ নেই। লিফটম্যানদের জন্য অল্পদিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানানো হয়। সরকারি আইনজীবী আদালতে আবেদন করে জানান, যে লিফট সাধারণ মানুষের সুবিধায় লাগে, তা মারণযন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। যাদের দায়িত্ব ছিল লিফটে বসা, তারা বাইরে ফুর্তি করছিল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনছিল। নিরাপত্তারক্ষীরা দেখে গিয়েছে, কিন্তু কোনও সাহায্য করেনি।
মৃত যুবকের ২১টি বুকের হাড় ভেঙে গিয়েছে। তাদের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানিয়ে মৃত অরূপের বাবা কমল বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবারের আইনজীবী শুভজ্যোতি দত্ত ও জয়দীপ দে জানান, ঘটনাস্থলে দশজন ছিলেন, যাঁরা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেননি। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি চারজন সিআইএসএফ জওয়ান ও একজন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধেও অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে। সব পক্ষের বক্তব্য শুনে ধৃতদের ২৭ মার্চ পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক। শনিবার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নির্দেশে তাপস মজুমদার, আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়রা পরিবারের পাশে গিয়ে দাঁড়ান।
