নগদ দেড় থেকে দু'লাখ টাকার বিনিময়ে তিনবছরের 'ফায়ার সেফটি' সার্টিফিকেট দমকল থেকে হাতে পেয়েছেন নিউ মার্কেটে সদ্য সিল হওয়া বহু হোটেল মালিক। সঙ্গে 'ফায়ার লাইসেন্স' পেতে আরও হাজার পঞ্চাশ বা তার চেয়ে সামান্য বেশি খরচ হয়েছে। মার্কুইজ স্ট্রিটের ঘুপচি ঘরের একাধিক হোটেল খুলতে দমকলের প্রাক্তন স্টেশন অফিসারকে লাখ টাকার স্রেফ 'প্যাকেট' পৌঁছে দিয়ে, নিশ্চিন্তে পুরসভার ট্রেড লাইসেন্স ও সিইএসসি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন লিজ হোল্ডাররা।
শিখা-ইন হোটেলে ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্তে নেমে বেনিয়মের 'অভয়ারণ্য' নিউ মার্কেটে 'সিল' হওয়া বেআইনি হোটেলের মালিকদের এমনই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি প্রকাশ্যে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, হোটেল মালিকরা গ্রেপ্তার হলে দমকল বা পুরসভার অফিসাররা কবে জেলে যাবেন? স্বভাবতই অগ্নিকাণ্ডের তদন্তকারী বিশেষজ্ঞ টিম এবং পুলিশের 'সিট' এর কড়া 'স্ক্যানারে' এখন গত ১০ থেকে ১২ বছরে দমকলের সদর দপ্তরে 'ফায়ার সেফটি' ও 'ফায়ার লাইসেন্স' এর দায়িত্বে থাকা অফিসাররা। সূত্রের খবর, শুধু নিউ মার্কেট জোনেই কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০টি বেআইনি হোটেল আগামী কয়েকদিনে ফায়ার সেফটি না থাকায় বন্ধ করে দিতে হবে।
২০০৩ সালে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে দমকল দফতরে লোক কম থাকায় 'ফায়ার সেফটি' ও 'ফায়ার লাইসেন্স' দুই সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য প্রাইভেট এজেন্সিকে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়ার কথা হয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর টেন্ডার হয়ে ১০-১২টি সর্বভারতীয় নামী দক্ষ সংস্থা 'গ্যারান্টি-মানি' জমাও দেয়। কিন্তু দমকলের শীর্ষ মহলের অফিসারদের তদারকিতে ও আলিমুদ্দিনের তীব্র আপত্তিতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মন্ত্রিসভার সেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। মার্কুইস স্ট্রিটের হোটেল সিল হতেই অন্যত্র সরছেন বোর্ডাররা।
দমকলের প্রাক্তন অধিকর্তা বিভাস গুহ শনিবার দাবি করেন, "যদি ২০০৩ সালে বুদ্ধবাবুর সরকারের ওই নজরদারির সিদ্ধান্ত কার্যকর হত তবে অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড কম হত।" পরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আসার পর তিন বছরের জন্য এই দুই সার্টিফিকেট দিতে অনলাইনে আবেদন চালুর পাশাপাশি ও হোটেল মালিকদের 'সেলফ ডিক্লারেশন' নেওয়া শুরু। হোটেল, রেস্তরাঁ থেকে শুরু করে হাসপাতাল বা বহুতলের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় দুই সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষমতা চলে যায় 'স্টেশন অফিসার' অথবা ডিরেক্টরদের হাতে। সেই সুযোগে হোটেল পিছু এক থেকে দেড় লাখ টাকা নগদে নিয়ে কিছু না দেখেই দিঘা-মন্দারমণি থেকে শুরু করে নিউ মার্কেটে পর পর সার্টিফিকেট দিতে শুরু করেন দমকলের অফিসাররা। ফায়ারের এই দুই সার্টিফিকেট দেখেই ট্রেড লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে। তাই তো তারাপীঠে বিদেশিনী হোটেলের আগুনের ঘটনায় স্টেশন অফিসার সাসপেন্ড হয়েছেন। শনিবার দমকলের সদর দফতরে বসে এক সিনিয়র অফিসার স্বীকার করেন, "ফায়ারের এই দুই সার্টিফিকেট দেওয়ার সুযোগে স্টেশন অফিসারের পোস্টিং হলেই তিন মাসের মধ্যে নতুন গাড়ি কিনে ফেলেছেন অনেকে। এখন তাঁরা ফেঁসে গিয়ে জেল যাওয়ার ভয়ে কাঁপছেন।"
