গৌতম ব্রহ্ম: কেবলমাত্র ঘুঘুর ডাক শুনবেন, আর তাই গাড়ির হর্ন বাজান না তিনি। এক-দু’ বছর নয়, টানা ১৮ বছর। হর্ন ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। সমতল থেকে পাহাড়, অলিগলি থেকে রাজপথ। অ্যাপ ট্যাক্সি থেকে নিজের গাড়ি, সর্বত্রই এই ফর্মুলা মেনে চলছেন কসবার বোসপুকুরের বাসিন্দা দীপক দাস।
[তাড়া করে বেড়াচ্ছে ধর্ষণের আতঙ্ক, রোহিঙ্গাদের জন্য এবার ‘রেপ অ্যালার্ম’]
কোনও এক দুপুরে গল্ফগ্রিনে বসে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ছিলেন দীপকবাবু। ‘এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে’, ‘যদি নির্জন দুপুরে ঘুঘুর গুনগুনে ধরা দাও, তবে আজীবন থেকে যেতে হবে বনে’ লাইন দু’টি ঝড় তোলে তাঁর মনে। গল্ফগ্রিনের শহুরে সবুজকে সাক্ষী রেখে শপথ নিয়ে ফেলেন দীপকবাবু। ‘গাড়িতে হর্ন নেই, এটা ভেবেই আজ থেকে গাড়ি চালাব।’। সেই থেকে চলছেই। একটু আধটু অসুবিধা যে হয়নি তা নয়। গাড়ির আরোহীরা বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু স্বভাব বদলাননি দীপক। আরও একটি অদ্ভুত বিষয় হল। গাড়িতে হর্ন না থাকার জন্য ট্রাফিক পুলিশের কাছে ‘কেস’-ও খাননি তিনি। উল্টে বেশ কয়েকটি এলাকায় বাড়তি সমীহ জোটে। এবার এই পরিবেশবান্ধব স্বভাবের জন্য পুরস্কৃত হতে চলেছেন কসবার বোসপুকুরের বাসিন্দা। তা-ও আবার পদ্মশ্রী করিমুল হকের মতো মানুষের সঙ্গে, একই মঞ্চে। ৮ ডিসেম্বর থেকে পাটুলিতে শুরু হচ্ছে তিনদিন ব্যাপী ‘মানুষমেলা’। সেখানেই ‘মানুষ সম্মান’-এ পুরস্কৃত করা হবে দীপকবাবুকে।
[মনোতোষের দুই স্ত্রীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার ৮০ রাউন্ড বুলেট]
২৬ বছর আগে লাইসেন্স হয়েছে দীপকবাবুর। কখনও নিজের গাড়ি চালিয়েছেন। কখনও ভাড়ার গাড়ি। পারকাশনিস্ট পণ্ডিত তন্ময় বোস, ঘট্টম-বাদক বিদ্যানাথনজির মতো বহু মানুষ দীপকবাবুর গাড়িতে চেপেছেন। সবাই দীপকবাবুর এই স্বভাবে মুগ্ধ। অনেকে ভাবেন, দীপকবাবু বোধহয় খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালান। ভুল ভাঙালেন দীপকবাবু। জানালেন, একদম নয়। একবার ‘ফকিরা’ ব্যান্ডের বেস গিটারিস্ট কুণাল পাসপোর্ট ফেলে এয়ারপোর্টে এসেছিলেন। ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে দীপকবাবু কুণালের পাটুলির বাড়ি হয়ে ফের এয়ারপোর্ট ফিরে এসেছিলেন। তা-ও আবার ব্যস্ত অফিস টাইমে। স্টিয়ারিং হাতে দার্জিলিং, সিকিম, ডুয়ার্স অনেক জায়গাতেই গিয়েছেন দীপকবাবু। ‘হর্ন ইজ এ কনসেপ্ট। আই কেয়ার ফর ইওর হার্ট’। এই বোর্ড ঝুলিয়ে পাহাড়ি রাস্তাতেও হর্ন বাজাননি। জানালেন, কলকাতা ‘হর্ন ফ্রি সিটি’ হবে, এটাই তাঁর স্বপ্ন।
[শীতের ধুন্ধুমার ব্যাটিং মহানগরে, ভাঙতে পারে ১৩১ বছরের রেকর্ড]
কিন্তু তা কি সম্ভব? ‘আলবত সম্ভব। কমিউনিটি সার্ভিস চালু করতে হবে। যদি কেউ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন তাহলে তাঁকে ঠিক ওই জায়গায় গলায় বোর্ড ঝুলিয়ে দু’দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। বলতে হবে, ‘আমি এই অন্যায় করেছি। আপনি প্লিজ করবেন না। তাহলে আমার মতো শাস্তি পেতে হবে’’, জানালেন দীপকবাবু। শুধু গাড়ি নয়, সাইকেলেও বেল নেই দীপকবাবুর। মানুষমেলা-র কর্নধার সৈকত সরকার জানালেন, “দীপকবাবুকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমিও চার বছর ধরে হর্ন ব্যবহার করি না। এই স্বভাব সংক্রামক হয়ে গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ুক।”
The post পরিবেশের স্বার্থে ১৮ বছরে একবারও গাড়ির হর্ন বাজাননি এই ব্যক্তি appeared first on Sangbad Pratidin.
