দেবাশিস কর্মকার: জগদীশ সৎসঙ্গ ভবন থেকে বেরিয়েই একদল যুবক গলায় সাপ পেঁচিয়ে সেলফি তুলতে শুরু করল। জ্যান্ত সাপ। একটি পোজে কুড়ি টাকা। তাতে কী? ভক্তদের মহাদেবের সাজ বলে কথা।
নিমতলায় চক্ররেলের লাইন মধ্যরাতে এমনিতে অন্ধকারে ডুবে থাকে। কিন্তু শ্রাবণের সোমে সেখানে আলোর ফোয়ারা। ভূতনাথ মন্দিরে বাবার মাথায় জল-দুধ ঢালতে লাখো ভক্তের সমাগম হয়। আর সেই সূত্রে মধ্যরাতেই খুলে যায় সংলগ্ন এলাকার সব মন্দির। দোকানগুলোয় ফুল, মিস্টি, দুধ-সহ পূজার্চনার সামগ্রীর বিক্রি মন্দ হয় না। বিভিন্ন মেমেন্টোর দোকান, চা-জলখাবারের স্টল, জুতো রাখা ইত্যাদি মিলিয়ে বাজারটা বেশ বড়। এর মধ্যেই সম্প্রতি সাপ গলায় জড়িয়ে ছবি তোলাটা নতুন হুজুগ।
মাঝে-মাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই রেললাইনের কংক্রিট স্লিপারে পা রেখে দাঁড়িয়ে তিন কিশোর। পরনে ছাপা লুঙ্গি, হাফ শার্ট, মাথার কাপড় পেঁচানো। হাতে ধরা খোলা ঝুড়ি। তার মধ্যে নেতিয়ে পড়া কালকেউটে। মন্দির থেকে ভক্তরা বেরিয়েই তাদের ছেঁকে ধরছে। সেই তিন কিশোর মহাব্যস্ত। ‘ফালতু’ কথায় তাদের মোটেই সময় নেই। তবু তার মাঝেই হাতে নগদ ধরিয়ে দিয়ে একজনকে রাজি করা গেল।
[আরও পড়ুন: নেতাজি নগরে দম্পতির রহস্যমৃত্যু, ঘর থেকে উদ্ধার রক্তাক্ত দেহ]
নাম বলল, দর্শন। সেটা যে সত্যি, তা হলফ করে বলতে পারি না। জানাল, মথুরা থেকে এসেছে। এই মাসটা এখানেই আছে। কথায় গোবলয়ের ব্রজভাষার টান। দর্শন বলল, “এই বছরই প্রথম এখানে সাপ নিয়ে এসেছি। কয়েকজনের দলে এসে বিভিন্ন মন্দিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছি। শিবজির ভক্তরা সাপ গলায় নিয়ে ছবি তুলতে পছন্দ করে।” আয় কত? খোলসা করে বলতে নারাজ দর্শন। তবে গড়পড়তা প্রতি মিনিটে একজন করে ‘ভক্ত’ জুটেই যায় এসময়। অর্থাৎ, আয় মন্দ নয়। দর্শন জানে কি, যে এইভাবে সাপ নিয়ে খেলা বেআইনি? বিলক্ষণ জানে।
আসলে মথুরা থেকে তাড়া খেয়ে এই সাপুড়েরা এখন কলকাতায় চলে আসছে। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ সরকার এই ‘সংস্কৃতি’ রুখতে কড়া অবস্থান নিয়েছে। শ্রাবণমাসের সোমবারে মথুরা ও বারাণসীর শিবমন্দিরের বাইরে সাপ নিয়ে বেআইনি ব্যবসা বন্ধে তৎপর হয়েছে সরকার। রাজ্য বনদপ্তর ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির পর অভিযানে প্রচুর সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু, সেই অসুখ এখন মহানগরে। প্রশাসনের নজরদারিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে সাপের সঙ্গে সেলফি।
[আরও পড়ুন: যে কোনও মুহূর্তে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠতে পারে কলকাতা, বলছেন বিশেষজ্ঞরা]
ঝুড়ি থেকে কোনওক্রমে ফণা তোলা সাপগুলো মৃতপ্রায়। বিশেষ করে গোখরোগুলোর। কারণ, সেগুলি নির্বিষ করা হয়েছে। বিষগ্রন্থি কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রদর্শনের জন্য সাপের ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ এবং ভারত সরকারের ২০১৪ সালের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে তা নিষিদ্ধ। হাওড়ার বঙ্গবাসীর বাসিন্দা গৌতম জয়সওয়াল বললেন, “খুব অল্প বয়স থেকেই শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার ভূতনাথে আসি বাবার মাথায় জল ঢালতে। এবারই দেখলাম নাগ এসেছে। শ্রাবণ মাসে নাগ স্পর্শ পুণ্যের শুনেছি। তাই সুযোগ পেয়ে গলায় নিয়ে ছবি তুলে রাখলাম।” আবার শ্যামবাজার থেকে আসা রোহিত সেনের কথায়, “ধর্মের নামে কোনও প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। এটা হুজুগ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
The post শ্রাবণ মাসে নাগ স্পর্শ পুণ্যের, শহরে কুড়ি টাকায় কালকেউটের সঙ্গে সেলফি! appeared first on Sangbad Pratidin.
