সন্ন্যাসী রাজা আজও ‘জীবিত’। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে সন্ন্যাসী রাজার বাড়িতেই মহানায়কের স্মৃতিচারণা করবে কলকাতা পুলিশ। কারণ, পার্ক স্ট্রিট এলাকার রিপন স্ট্রিটে পুলিশের ঐতিহাসিক ভবনটি ভাওয়াল পরিবারের বাড়ি। ঢাকার ভাওয়ালদের মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ এই বাড়িতে থেকেই লড়েছিলেন সেই বিখ্যাত ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা’। আর ওই মামলার উপর ভিত্তি করেই ১৯৭৫ সালে তৈরি হয় ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিটি। এই ছবিরই নায়ক মহানায়ক উত্তমকুমার। তাঁর জন্মশতবর্ষের আগেই কলকাতা পুলিশ রিপন স্ট্রিটের বাড়ির একতলা বাড়ি সেজে উঠছে। তুলে ধরা হচ্ছে ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার ইতিহাসও।
লালবাজারের এক আধিকারিক জানান, বহু পুরনো এই বাড়িটিতে রয়েছে কলকাতা পুলিশের পাঠাগার। এ ছাড়াও রয়েছে ট্রাফিক মিউজিয়াম ও পুলিশ মিউজিয়ামের একটি অংশ। কিন্তু ইতিহাস সম্বলিত এই বাড়িটির মেরামতির প্রয়োজন। সম্প্রতি লালবাজারের কয়েকজন কর্তা রিপন স্ট্রিটের এই রাজবাড়িটি পরিদর্শনও করেন। কীভাবে মেরামতির পর এই বাড়িটি সাজিয়ে তোলা হবে, তা নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনাও করেছেন লালবাজারের কর্তারা। সেই কারণে উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে খুব জাঁকজমক করে পালন না করলেও নিজেদের মতো করেই তাঁরা স্মৃতিচারণ করবেন মহানায়কের।
‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিতে রাজা সূর্যকিশোরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার। আসল ঘটনার মতো এই ছবিতেও প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও রাজা সূর্যকিশোরকে মৃত মনে করে শ্মশানে ফেলে রেখে পালিয়েছিলেন পরিজনরা। সন্ন্যাসীরা তাঁকে উদ্ধার করে সুস্থ করে তোলেন। স্মৃতি লোপ পেয়েছিল তাঁর। পরে ফিরে আসেন নিজের বাড়িতে। এরপরই শুরু হয় মামলা। এই ছবিতে উত্তমকুমারের অভিনয় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে স্তোত্রপাঠ ‘কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ’ রয়েছে আপামর বাঙালির হৃদয়ে। কলকাতা পুলিশের ভবনটিতে রয়েছে সন্ন্যাসী রাজার রূপে রাজার আসনে বসা উত্তমকুমারের সেই ছবি। তার সঙ্গে রয়েছে ভাওয়ালদের আসল মেজোকুমারকে নিয়ে লেখা একটি ইংরেজি বই ‘এ প্রিন্সলি ইমপোস্টার?’-এর কভারের ছবিও।
আবার এখানেই তুলে ধরা হয়েছে রিপন স্ট্রিটে কলকাতা পুলিশের এই ভবন আর ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার ইতিহাসও। সেখানেই উল্লেখ করা রয়েছে যে, রিপন স্ট্রিটের এই বাড়িটি ১৮৭৪ সালে আর ই টিডাল নামে একজনের কাছ থেকে নদিয়ার রজা ক্ষীতিশচন্দ্র রায় কেনেন। ১৯১২ সালে মুচিপাড়ার সুরেন্দ্রনাথ মুট্টিলাল এই সম্পত্তি কিনে মেয়ে সরজুবালা দেবীকে উপহার দেন। সরজুবালাই হচ্ছেন ঢাকার ভাওয়াল পরিবারের বড়কুমার রণেন্দ্রনারায়ণ রায়ের স্ত্রী। ১৯০৯ সালের এপ্রিলে ভাওয়ালদের অসুস্থ মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণকে নিয়ে দার্জিলিংয়ে যান তাঁর স্ত্রী বিভাবতী দেবী, শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও পরিবারের চিকিৎসক আশুতোষ দাশগুপ্ত। ৮ মে রমেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরই নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। ১৯২০ সালে ঢাকার মানুষের মধ্যে প্রচার হয় যে, সন্ন্যাসী হয়ে ফিরে এসেছেন রমেন্দ্রনাথ। তা মেনে নেননি বিভাবতী বা তাঁর দাদা। তাই শুরু হয় ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা। ওই মামলা চলাকালীন রমেন্দ্রনাথ রিপন স্ট্রিটে তাঁর বউদির বাড়ি তথা রাজবাড়িতেই থাকতেন। এখানে থেকেই তিনি মামলা লড়েন। অবশেষে ১৯৩৬ সালের ২৪ আগস্ট বিচারক পান্নালাল বসু রায় দেন, সন্ন্যাসীই আসলে রাজা রমেন্দ্রনাথ। পরে উচ্চ আদালত, এমনকী, প্রিভি কাউন্সিলও সেই রায় বজায় রাখে। ১৯৪৬ সালে প্রিভি কাউন্সিলের রায়ের দু’দিন পরই মৃত্যু হয় ওই সন্ন্যাসী রাজার।
