সুতীর্থ দাস: কলকাতা ঘুরে দেখছেন তিনি। কিন্তু কলকাতা তাঁর দিকে ঘুরেও তাকায়নি। গত চারদিন ধরে এ শহরেরই আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মার্সেলো পেদাল ভার্দে। তবু শহর নির্বিকার। হয়তো কেউ বিস্মিত হয়েছেন। কেউ আবার উদ্ভট বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কাছে গিয়ে দু’দণ্ড বসার ফুরসত কারও হয়নি।
খটকা অবশ্য আমাদেরও লেগেছিল। রবিবার সকালে বেরিয়েছিলাম বাজারে। বাইপাসের ধারে পাটুলির কাছে বাজারটাই গন্তব্য। আচমকাই দেখলাম একজন মানুষ স্কেটবোর্ডে চড়ে রাস্তার পাশ দিয়ে সরসরিয়ে এগোচ্ছেন। ব্যাপার কী? আমার সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, ভাবলেন, কমবয়েসি কেউ বোধহয় খেয়ালখুশিতে এ কাজ করছে। কিন্তু নজর কাড়ল মানুষটির মাথার হেলমেটটি। অনেকটা বাইকার্সদের মতোই। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে থামালাম। জানতে চাইলাম, কে তিনি? কেনইবা বাইপাসে স্কেটবোর্ড নিয়ে এভাবে চলেছেন? আর তারপরই চমকের পালা। জানা গেল, তিনি আদতে রাশিয়ার মানুষ। বেরিয়েছেন বিশ্বভ্রমণে। সঙ্গী বলতে এই স্কেটবোর্ড। যেখানে তা চলে না, সেখানে অবশ্য অন্য যানেই ভরসা রাখেন। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য, তাঁর এই নিজস্ব স্কেটবোর্ডে চড়েই বিশ্বভ্রমণ।
আলাপ আরও জমল। কথায় কথায় জানা গেল, গত চারদিন ধরে কলকাতাতেই আছেন তিনি। ঘুরে দেখেছেন শহরের অনেক কিছু। যদিও আলাদা করে নাম বলতে পারলেন না। হয়তো কেউ তাঁকে বলেও দেননি কোনটা কী। তবু এ শহরকে যে তাঁর ভাল লেগেছে, জানাতে কুণ্ঠা করলেন না। রবিবারই শেষ দিন। তারপর শহর ছাড়বেন। তাই দ্রুত যতটা দেখা যায় ততটা দেখে নিচ্ছেন।
[ শীতের আগমনী শোনাল হাওয়া অফিস, মাঝ নভেম্বরে পড়বে ঠান্ডা ]
তাঁর বিশ্বভ্রমণের ফিরিস্তিও বেশ তাক লাগানো। সেই ২০০৯ সালে ব্রাজিল থেকে যাত্রা শুরু করেছেন। তারপর বিভিন্ন দেশের নানা শহরে ঘোরা। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বুঁদ। যখন যেখানে ক্লান্ত হয়ে পড়েন সেখানেই রাত্রিবাস। কোনও পরিকল্পনা নেই। অ্যাডভেঞ্চারে তা থাকার কথাও নয়। স্কেটবোর্ডের পিছনেই নিজস্ব কিছু সরঞ্জাম রেখে দিয়েছেন। হোটেল বা গেস্ট হাউস পেয়ে গেলে ভাল। নইলে তাঁবু তো আছেই। গাছতলাই সই। বাংলাদেশ হয়ে এসেছেন কলকাতায়। তাঁর মনে হয়েছে, বাংলাদেশ-মায়ানমারে বোধহয় যুদ্ধ বেধেছে। বলতে বলতে চোখে-মুখে উদ্বেগ ফুটে উঠছে ভিনদেশি মানুষটির। আসলে গোটা বিশ্বকেই যিনি নিজের দেশ করে নিয়েছেন, এ সংবাদে তিনি চঞ্চল না হয়ে থাকেন কী করে!কলকাতা থেকে পাড়ি দেবেন নেপালে। সেখান থেকে আরও বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার স্বপ্ন লালন করে চলেছেন মনে। তাই কে তাঁর দিকে তাকাল, কে জিজ্ঞেস করল আর করল না, সেদিকে ভ্রূক্ষেপমাত্র নেই।
অবশ্য এসব তিনি এমনি এমনি করছেন না। ঘোরার নেশা তো আছেই। দোসর ফুটবলপ্রেম। ব্রাজিলের ভক্ত তিনি। গতবারের বিশ্বকাপ কেটেছে দুঃস্বপ্নের মতো। আশা, এবার অন্তত খরা কাটবে। সুতরাং ভরসায় বুক বাঁধা। আর প্রিয় দেশের সমর্থনে, স্রেফ ফুটবলকে ভালবেসেই বিশ্বে বেরিয়ে পড়া। পরনের পোশাকে ব্রাজিলের ছাপ স্পষ্ট। তাঁর আশা, বিশ্ববাসী তাঁকে দেখবে আর ভালবাসতে শিখবে ব্রাজিলকে। সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেবে নেইমারদের দিকে।
[ বিরল দৃশ্য, সোমবার পরস্পরের খুব কাছাকাছি আসবে বৃহস্পতি ও শুক্র গ্রহ ]
কিন্তু তিনি নিজে সমর্থন কতটা পেলেন? বিশেষত কলকাতাবাসীর? এমন একজন লোক শহরে চারদিন ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর কেউ তাঁকে ঘিরে ধরে ভিড় করছেন না! এ কলকাতা তো চিরকালই অন্যরকম। ফুটবোর্ডে ঝুলতে ঝুলতে যিনি যান, তিনিও আর একজনের হাত ধরে টেনে তোলেন। চেনা কি অচেনা সে প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। এটাই তো কলকাতা। সেখানে কেউ এরকম একজন মানুষকে আপন করে নিলেন না? পাংশু মুখে মার্সেলোর উত্তর, সম্ভবত এখানে কেউ আমার স্কেটবোর্ডকে পছন্দ করছে না। তাই কেউ কথাও বলেননি। না কোনও প্রেস, মিডিয়া তো দূরে থাক, আম নাগরিকও এগিয়ে এসে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
মার্সেলোর হাতে সময় কম। দিনে গড়ে প্রায় ৮০ কিমি পথ অতিক্রম করেন। আজকের দিনটি থেকেই কলকাতা ছাড়তে হবে। অগত্যা বিদায় জানাতে হল মার্সেলোকে। তার স্কেটবোর্ড বাইপাস ধরে এগোতে থাকল। এগিয়ে যাচ্ছে তাঁর অ্যাডভেঞ্চারের এক একটা স্বপ্নের মাইলস্টোনে। আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খটকা লাগল। সত্যিই কি চেনা কলকাতা তবে অনেকখানি বদলে গেলো!
ছবি ও ভিডিও: লেখকের সৌজন্যে
The post বিশ্ব ঘোরার নেশায় স্কেটবোর্ডেই কলকাতায়, ফিরেও তাকাল না শহর appeared first on Sangbad Pratidin.
