কংগ্রেস আগামী বিধানসভা ভোটে (West Bengal Assembly Election) ২৯৪ আসনেই একা লড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতেই এক ঝটকায় অনেকগুলি সিটে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ এসে গিয়েছে সিপিএমের সামনে। স্বভাবতই আলিমুদ্দিনের অন্দরে এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে, কে কোন আসনে লড়বেন তা নিয়ে। কিন্তু কিছুটা লজ্জার হলেও বাস্তব তথ্য হল, তথাকথিত সিপিএমের ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীরা কেউই ২০২১ সালে যে আসনে ভোটে দাঁড়িয়ে গোহারা হয়েছিলেন, সেই সিটে প্রার্থী হতে রাজি হচ্ছেন না।
কারণ গত বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) মমতার ‘খেলা হবে’ স্লোগানের ঝড়ে শুধুমাত্র ভোটে হারেননি, অধিকাংশ সিটের পাশাপাশি নিজেদের বুথেও কাস্তে হাতুড়ি প্রতীকের জামানত জব্দ হয়েছিল সিপিএম প্রার্থীদের। গত পাঁচ বছর যাঁরা সাধারণ মানুষের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে গণ আন্দোলনের পরিবর্তে ফেসবুক, টুইটারের মতো সমাজমাধ্যমে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, তাঁরাই পুরনো আসনের পরিবর্তে অন্য সিটে লড়তে চাইছেন বলে খবর। এঁদের আবার একটা অংশ নিজেদের পেটোয়া নিউজ পোর্টাল দিয়ে নতুন আসনে প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম ‘খাইয়ে’ দিচ্ছেন। সোশাল মিডিয়ায় সেই সব আসন ও প্রার্থীদের নাম প্রকাশ হতেই সিপিএমের নিচুতলার কর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
পার্টি কর্মীদের অভিযোগ, এই সব পরিযায়ী প্রার্থীদের এলাকায় কোনও দরকার নেই। সারা বছর আমরা পার্টির ঝান্ডা পাড়ায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়ব, আর এঁরা শুধুমাত্র ফেসবুক-এক্স হ্যান্ডলে গরমাগরম জ্ঞান দেবেন, এঁরা কেউই সাধারণ মানুষের দাবি নিয়ে রাস্তায় থাকেন না, ভোটপাখি এই সব পরিযায়ীদের প্রার্থী হিসাবে চাই না। পার্টি কর্মীদের আরও বক্তব্য, এমনিতেই জোট না হওয়ায় কংগ্রেস সমর্থন আমাদের ভোট বাক্সে আসবে না, তার উপর এইসব পরিযায়ীদের প্রার্থী করলে সিপিএম আরও ডুববে।
পার্টি কর্মীদের অভিযোগ, এই সব পরিযায়ী প্রার্থীদের এলাকায় কোনও দরকার নেই। সারা বছর আমরা পার্টির ঝান্ডা পাড়ায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়ব, আর এঁরা শুধুমাত্র ফেসবুক-এক্স হ্যান্ডলে গরমাগরম জ্ঞান দেবেন, এঁরা কেউই সাধারণ মানুষের দাবি নিয়ে রাস্তায় থাকেন না, ভোটপাখি এই সব পরিযায়ীদের প্রার্থী হিসাবে চাই না।
এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ভোটার তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষকে আন্তরিক-সাহায্যের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছে। কিন্তু টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা সিপিএম এখনও কাদের সঙ্গে জোট করে ভোট লড়বে, তা নিয়ে চরম দোলাচলে। তবে কংগ্রেস একা লড়ার ঘোষণা করতেই পার্টির তরফে জেলায় জেলায় অতিরিক্ত প্রার্থী দেওয়ার ‘চাপ’ তৈরি হওয়ায় যথেষ্ট বিপাকে সিপিএম। কারণ, একদিকে যেমন জুতসই প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে, পার্টির তথাকথিত ‘হেভিওয়েট’ নেতা-নেত্রীরা কেউই নিজের হারা আসনে আর লড়াইয়ে নামবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অভিযোগ, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, শতরূপ ঘোষ, সৃজন ভট্টাচার্য, সপ্তর্ষি দেব, সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘নয়া প্রজন্মে’র প্রার্থীরা ভোটে হেরে যাওয়ার পর আর পুরনো বিধানসভা কেন্দ্রমুখো হননি। একইভাবে মহম্মদ সেলিম চণ্ডীতলা, টালিগঞ্জে দেবদূত ঘোষ, দমদম উত্তরে তন্ময় ভট্টাচার্য বা দুর্গাপুর পূর্বে আভাস রায়চৌধুরিরা পা রাখেননি বলে অভিযোগ। এমনকী, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের পার্টি কর্মীরা বিপদে পড়লেও তাঁদের পাশে দাঁড়ানো দূরের কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফোনও ধরেননি বলে ক্ষোভ।
সোমবার সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এক প্রবীণ নেতার আক্ষেপ, পাঁচ বছর ধরে এঁরা ফেসবুক-টুইটারে ভেসে থাকলেও নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রের কর্মীদের পাশে থাকেননি বলেই পার্টির আজ এই বেহাল দশা। যদি পাঁচ বছর নন্দীগ্রাম থেকে কসবা-বেহালা-দমদম-সিঙ্গুরে এঁরা নিজের পুরনো কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতেন, পার্টি ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে মানুষের পাশে থাকতেন, তাহলে ভোটের অঙ্কে লাল ঝান্ডা অনেক এগিয়ে যেত। অবশ্য পার্টি কর্মীদের এই ক্ষোভ বা আক্ষেপকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে মহম্মদ সেলিম থেকে শুরু করে শতরূপ-মীনাক্ষীরা নতুন কেন্দ্র খুঁজতে শুরু করেছেন। নিজেদের পেটোয়া নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত তালিকার সূত্র বলছে, চণ্ডীতলার বদলে মহম্মদ সেলিম হুমায়ুন কবীরের অনুগ্রহে রেজিনগর অথবা ভরতপুরে, শতরূপ ঘোষ কসবার পরিবর্তে দমদম উত্তরে, রাজারহাট-নিউটাউনের পরিবর্তে প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষি বসিরহাট উত্তরে প্রার্থী হতে চাইছেন। এখানেই শেষ নয়, নন্দীগ্রামে গতবার প্রার্থী হওয়া মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় আসন্ন ভোটে উত্তরপাড়ায়, বালির পরিবর্তে ডোমজুড়ে দীপ্সিতা ধর, সিঙ্গুরের বদলে কসবায় সৃজন ভট্টাচার্য প্রার্থী হওয়ার চেষ্টায় আছেন।
২০২১ সালের প্রার্থীদের নিয়ে নিচুতলার কর্মীদের অভিযোগকে মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বাধীন সিপিএম পার্টি বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয়নি, উল্টে এই সব তথাকথিত ‘হেভিওয়েট’ নতুন মুখদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘প্রমোশন’ দিয়েছে। যেমন– সিঙ্গুরে বিধানসভা ভোটে গোহারা সৃজনকে যাদবপুরে এবং বালিতে তৃতীয় হওয়া দীপ্সিতাকে শ্রীরামপুর লোকসভা কেন্দ্রে ২০২৪-এর নির্বাচনে পার্টির প্রার্থী করেছিল আলিমুদ্দিন। পার্টির এমন সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে এলাকার বহু কমরেড বসে গিয়েছেন বলে জেলা সিপিএম রিপোর্ট দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই আলিমুদ্দিনের।
