বঙ্গভোটের ইতিহাসের আজ তৃতীয় পর্ব। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে থাকতে চোখে রাজনৈতিক ছানি পড়ে গিয়েছিল বামেদের। না, নন্দীগ্রাম শুধু নয়, বামেদের পতনের নেপথ্যে ছিল আরও বহু কারণ। এই পর্বে রইল সেইসব নেপথ্য কারণ। অপ্রিয় সত্য এই যে, জ্যোতি বসুও খুনের সংস্কৃতি থামাতে পারেননি। এবং দুঃখজনক যে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে থেকে যাবেন ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হয়েই। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল।
পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম শাসনের অবসান, সেই গপ্প বলতে গিয়ে প্রসঙ্গ এসেছিল নন্দীগ্রামের। গত পর্বে বলছিলাম, কফিনের শেষ পেরেক ঠোকা হল সেইদিন, যেদিন গুলি চলল নন্দীগ্রামে। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য গুলি চলার পরও ভাবতে রাজি ছিলেন না যে, এতদিনের বাম শাসনের বিদায় আসন্ন। রাইটার্সে ওঁর ঘরে বসে বলেছিলাম, মানুষ কিন্তু বিরক্ত! সিঙ্গুরে শিল্পায়নের আশায় যে বাঙালি বুক বেঁধেছিল, তাঁরাই নন্দীগ্রাম কাণ্ডের পর যারপরনাই ক্ষুব্ধ! বুদ্ধবাবু কিছুতেই মানতে রাজি ছিলেন না যে, এমন একটা পরিণতি অচিরেই হতে চলেছে। ধপধপে সাদা পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত তুলে বলেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবাংলার মানুষ এত বোকা নয়। তারা আর যাই হোক, তৃণমূলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে না।’’
বাম জমানার শেষ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য 'ট্র্যাজিক হিরো'।
সবসময় এমনটাই হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতার কুর্সিতে আসীন মানুষ বোধহয় দেওয়াল লিখন ঠিকভাবে পড়তে পারেন না। রাজনৈতিক ছানি পড়ে। তবে আরম্ভের আগে সবসময় আরম্ভ থাকে। সিপিএমের পতন শুধু নন্দীগ্রামের জন্য হয়েছে – একথা বললে মস্ত বড় ভুল হবে। পশ্চিমবঙ্গে বামশাসনের আমলে দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্র কালিমালিপ্ত হচ্ছিল, সেসবই বোধহয় পতনের নেপথ্যে।
সিপিএমের পতন শুধু নন্দীগ্রামের জন্য হয়েছে – একথা বললে মস্ত বড় ভুল হবে। পশ্চিমবঙ্গে বামশাসনের আমলে দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্র কালিমালিপ্ত হচ্ছিল, সেসবই বোধহয় পতনের নেপথ্যে।
কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চেপে আজ চলে এসেছি ছয়ের দশকে! ১৯৬৭। কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটেছিল। ক্ষমতায় এসেছিল বিভিন্ন কংগ্রেস বিরোধী রাজনৈতিক দলের আঁতাঁত। কিন্তু প্রথম থেকেই ক্ষমতাসীন সেই শরিক দলের মধ্যে ঝগড়া। ঝগড়ার পরিণতিতে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার বরখাস্ত হয়। শুরু হয় রাজনৈতিক ডামাডোল, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। এই বিশৃঙ্খলার প্রতিক্রিয়ায় সারা রাজ্যে অপরাধের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বেড়ে গিয়েছিল পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা। মন্ত্রিসভা বরখাস্তের পর তৈরি হল ক্ষণস্থায়ী সংখ্যালঘু মন্ত্রিসভা। তারপর রাষ্ট্রপতি শাসন। ১৯৬৯ সালে ভোটে কংগ্রেস বিরোধী দলগুলো বিপুল ভোটে ক্ষমতা দখল করে গঠন করল মন্ত্রিসভা। এ হল দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা। আর সেই মন্ত্রিসভায় সিপিআইএম, সিপিএম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মুখ্যমন্ত্রী হন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। ফাইল ছবি
দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সময়ও আইনশৃঙ্খলার তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। তখন অবশ্য সবাই লক্ষ করেছিল যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস সরকারগুলোর প্রধান লক্ষ্যই ছিল কমিউনিস্টদের কী করে আটকানো যায়? দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা টেকেনি। ’৭০ সালের মার্চ মাসের মধ্যে সরকারের পতন হল। তখন থেকেই শুরু হল পশ্চিমবঙ্গে ভয়াবহ হিংসার রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গে তখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে গিয়েছে। রাজ্যপাল ছিলেন ডায়াস সাহেব। আর অন্যদিকে চলছে খুন-জখম, রাহাজানি, গুলি। নকশাল আন্দোলন শুরু হল দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট আমলে। রাষ্ট্রপতি শাসন ১৯৭০ থেকে ১৯৭২। সেই নকশাল আন্দোলন বিরাট বড় ঘটনা হয়ে দেখা দিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে।
দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সময়ও আইনশৃঙ্খলার তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। তখন অবশ্য সবাই লক্ষ করেছিল যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস সরকারগুলোর প্রধান লক্ষ্যই ছিল কমিউনিস্টদের কী করে আটকানো যায়? দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা টেকেনি। ’৭০ সালের মার্চ মাসের মধ্যে সরকারের পতন হল।
’৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, তাঁদের ১১০০ জন কর্মী খুন হয়েছে। সবাই ভেবেছিল, যুক্তফ্রন্ট আমলে যে হিংসা-খুনোখুনি হয়েছিল, তা জ্যোতি বসুর আমলে বন্ধ হবে। কিন্তু জ্যোতিবাবুর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় খুনের রাজনীতি চলতেই থাকল। অনিল বিশ্বাস বলছেন, সাড়ে তিন বছরে সিপিএম দলের কর্মীরা, বামফ্রন্টের কর্মীরা ১৮০ জন খুন হয়েছিল। তার মধ্যে ১৬৮ জনই সিপিএম কর্মী। অন্যদিকে তখন ইন্দিরা কংগ্রেসের সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলছেন, কংগ্রেস দলেরও ৯৬ জন খুন হয়েছেন। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরও এই হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতেই থাকল। কথায় কথায় তদন্ত কমিটি গঠনের সংস্কৃতি তৈরি হল। তদন্ত কমিশন হলে আরও ভালো। বিচারবিভাগীয় তদন্ত? আরও উত্তম ব্যবস্থা! কেননা অভিজ্ঞতা বলে, তদন্ত কমিশন গড়লে উত্তেজনা কমে যায়। বিচারবিভাগীয় তদন্ত? মানুষের আস্থা আরও অর্জন করা যায়। কমিশনের রিপোর্ট যখন দাখিল হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর উত্তেজনা থাকে না।
১৯৮০ সাল থেকে বাম সরকারের আমলে আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে আটটি বিচারবিভাগীয় কমিশনের হিসেব করলে দেখা যাবে, শেষ পর্যন্ত সেইসব রিপোর্টে কী সুপারিশ করা হয়েছিল, তা আর জানা যায়নি। যেসব অফিসার ওই কমিশনে ছিলেন তাঁরা রিটায়ার্ড হয়ে গেলেন!
১৯৮২ সালে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে। তার ঠিক আগে দক্ষিণ কলকাতায় আনন্দমার্গীদের হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। বিজন সেতুর ওপরে অন্তত ১৮ জন আনন্দমার্গী নৃশংসভাবে খুন হন। রাজনীতি উত্তাল হয়ে যায়! বিরোধীরা ক্ষমতাসীন দলের বিধায়ক শচীন সেন (সিপিএমের) বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছিলেন। শেষ পর্যায়ে উত্তেজনা শান্ত করার জন্য জ্যোতিবাবু তদন্ত করার উদ্দেশ্যে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এস. এন. দেব-এর নেতৃত্বে ’৮২ সালের ১২ মে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। সেই কমিশনে কোনও তথ্যপ্রমাণ বা বিবৃতি দাখিল হয়নি। এক বছর আটমাস অপেক্ষা করে ১৯৮৩ সালে ৩০ নভেম্বর রাজ্য সরকার কমিশনটাই বন্ধ করে দিলেন। আর এই এক বছর আট মাস কমিশনের কর্মচারীরা বিনা কাজে মাইনে পেয়েছে। বিচারপতি দেব মহাশয়কে মাইনে-গাড়ি সবই দিতে হয়েছে সরকারের তরফে।
বাম জমানায় সবচেয়ে বেশি সময়ের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। ফাইল ছবি
মানুষ ভাবল, আবার রোমহর্ষক ষড়যন্ত্রের কাহিনি দেবে সেই কমিশন। কিন্তু সেই কমিশনের তরফে কোনও বিবৃতি, কোনও অভিযোগ, কিছুই জমা পড়ল না। কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে গেল। এইভাবেই একের পর এক কমিশন আর আরেক দিকে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে হিংসা। তারপর একটা সময় দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র ধীরে ধীরে রিগিংতন্ত্রে পর্যবসিত হচ্ছে।
১৯৮১ সালে আরামবাগ পঞ্চায়েত ও মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে হাঙ্গামা হয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে অসম্মান করা নিয়ে তুমুল বিক্ষোভ হল। প্রফুল্লচন্দ্র সেন অনশন করেছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেনের প্রতি মর্যাদা দেখানোর জন্য ’৮১ সালের ২৬ জুন রাজ্য সরকার বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন ঘোষণা করে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ. এম. বন্দ্যোপাধ্যায়কে কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মানুষ ভাবল, আবার রোমহর্ষক ষড়যন্ত্রের কাহিনি দেবে সেই কমিশন। কিন্তু সেই কমিশনের তরফে কোনও বিবৃতি, কোনও অভিযোগ, কিছুই জমা পড়ল না। কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে গেল। এইভাবেই একের পর এক কমিশন আর আরেক দিকে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে হিংসা। তারপর একটা সময় দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র ধীরে ধীরে রিগিংতন্ত্রে পর্যবসিত হচ্ছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ সালের নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন ছিল। বিধান রায় ১৯৬২ সালে মারা যান। মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্ল সেন। ৬৭ সালে নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ২৮০টি আসনের বিধানসভায় কংগ্রেস দল পেল ১২৭টি আসন। বাকি আসনে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট, বাংলা কংগ্রেস, সিপিআই – এসব নানা দল জিতেছিল। কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যপাল বৃহত্তম দলকে মন্ত্রিসভা গঠন করতে ডাকবেন! কিন্তু কংগ্রেস দল সেই সুযোগ নেয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের শেষে কংগ্রেস ঘোষণা করল তারা মন্ত্রিসভা গড়তে আগ্রহী নয়। অর্থাৎ, এমএলএ ভাঙাভাঙির খেলায় নামবে না। এই নীতিতে কংগ্রেস ১৯৬৭ সালে রাজনীতিতে উচ্চমানের সংস্কৃতির পরিচয় দিয়েছিল। প্রফুল্ল সেন এবং অতুল্য ঘোষকে বাংলার নির্বাচনের ইতিহাসে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এখনও মানুষ অভিনন্দন জানায়।
বাম-ডান সব জগাখিচুড়ি মার্কা মন্ত্রিসভা হয়েছে। সেগুলো ক্ষণস্থায়ী হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন অবাধ হত। গণতান্ত্রিক ভোটাভুটিতে মানুষের আস্থা ছিল।
কংগ্রেস সরে দাঁড়ানোয় বাংলা কংগ্রেসের হুমায়ুন কবীর, অজয় মুখোপাধ্যায়রা নানা দলকে জোড়াতালি দিয়ে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। হয়তো সেই মন্ত্রিসভা বেশিদিন টেকেনি। পরপর দু’বার জোড়াতালি দেওয়া যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা টেকেনি। কিন্তু নির্বাচনে রিগিংয়ের অভিযোগও কিন্তু তখন ওঠেনি। ’৬৭ পর ’৬৯-এ বিধানসভা নির্বাচন হয়। ১৯৭১ সালে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। বাম-ডান সব জগাখিচুড়ি মার্কা মন্ত্রিসভা হয়েছে। সেগুলো ক্ষণস্থায়ী হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন অবাধ হত। গণতান্ত্রিক ভোটাভুটিতে মানুষের আস্থা ছিল।
কিন্তু প্রথম আঘাত এল ১৯৭২ সালে। একদিকে নকশাল তাণ্ডব, অন্যদিকে মার্কসবাদীদের অগ্রগতি। এই অবস্থায় ‘৭২-এর নির্বাচনে প্রথম শোনা গেল রিগিংয়ের কথা। ভোটাভুটিতে রিগিং হয়েছে। তখন একটা স্লোগান তোলা হয়েছিল, গণতন্ত্র আনতে গণতন্ত্র হত্যা করা দরকার। ‘Kill Democracy to Save Democracy.’ ১৯৭২এ-এর নির্বাচনে রিভলবার, পিস্তল, ছোরা, বোমা – এসব আমদানি হয়েছিল। কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরে এল। অন্যদিকে ব্যাপক রিগিংয়ের অভিযোগ করে বৃহত্তম বিরোধী মার্কসবাদীরা পাঁচ বছর বিধানসভায় যোগ দেয়নি। মার্কসবাদীদের মতে, রিগিং করে ইন্দিরা কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। ’৭২ থেকে ’৭৭ পর্যন্ত বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ইন্দিরা কংগ্রেস মন্ত্রিসভা (মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়) পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকল।
বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসের সিদ্ধার্থশংকর রায়। ফাইল ছবি
কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরে এল। অন্যদিকে ব্যাপক রিগিংয়ের অভিযোগ করে বৃহত্তম বিরোধী মার্কসবাদীরা পাঁচ বছর বিধানসভায় যোগ দেয়নি। মার্কসবাদীদের মতে, রিগিং করে ইন্দিরা কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। ’৭২ থেকে ’৭৭ পর্যন্ত বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ইন্দিরা কংগ্রেস মন্ত্রিসভা (মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়) পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকল।
তারপরে এল ’৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন। কেন্দ্রে তখন জনতা সরকার। লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বলে অন্তত আটটা কংগ্রেস মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে মন্ত্রিসভা ভেঙে রাষ্ট্রপতি শাসন হল। অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন আইসিএস অফিসার তিমপুতকার। খুব কড়া অফিসার। ’৭৭-এর নির্বাচন নির্বিঘ্নে হয়েছিল। মার্কসবাদীদের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। তারপর বহুদিন ক্ষমতায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা, ওদের আমলেই রিগিংয়ের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। লোকসভায় ’৮৯-র নির্বাচনে বিহারে ৪০ জন খুন হয়েছিল। বিহারে তখন একটা কথা চালু হয়েছিল ‘ডান্ডা যার, ভোট তার’। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, হিন্দিবলয়ও কম যেত না। ১৯৮৮ সালের ত্রিপুরা নির্বাচনেও অন্তত ১০৫ জন খুন হয়েছিল। ত্রিপুরায় তখন ক্ষমতাসীন ছিল মার্কসবাদীরা। পশ্চিমবঙ্গে ’৭৭-এ নির্বিঘ্নে ভোটাভুটি হওয়ার পর আরও দু’বার বিধানসভা নির্বাচন হয়। ’৮২-তে ,’৮৭-তে। ‘৭৭-এ আইসিএস অফিসার তিমপুতকার অবাধ নির্বাচন করেন! ততখানি নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রমাণ কিন্তু মার্কসবাদী মন্ত্রিসভা আর দিতে পারল না। শুরু হল রিগিংয়ের সংস্কৃতি।
অতএব বলা যায়, রোম সাম্রাজ্য যেরকম একদিনে তৈরি হয়নি, ধ্বংসও কিন্তু একদিনে হয়নি। সাম্রাজ্য তৈরি হতে যেমন সময় লাগে, পতনেরও একটা ব্যাকরণ আছে। একটা পাথরের উপর যখন খরস্রোতা নদীর জল এসে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় পাথরের কিছুই হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে একদিন দেখা যায় যে, ওই জল পাথরকেও ফুটো করে দিতে সক্ষম হয়।
কল্পনার অ্যাম্বাসাডরে চেপে যখন ঘুরছি যুক্তফ্রন্ট থেকে বামফ্রন্টের প্রাথমিক দিনগুলোয়। তখন শুধু হিংসার আমদানি বা রিগিং নয়, যে পুলিশ নন্দীগ্রামে গুলি চালিয়েছিল সে পুলিশের ব্যবস্থাতেও পচন ধরেছে জ্যোতি বসুর আমল থেকেই। একবার তো কলকাতার পুলিশ কমিশনার বিবৃতি দিয়ে বলেই দিয়েছিলেন, কলকাতা শহরে অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে তো বাড়ছেই। কী কাণ্ড! অবশ্য তিনি বলেন, মিসা আইন পুলিশের অভ্যাস পালটে দিচ্ছে।
১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মন্ত্রিসভাতেই ‘স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট’ বা ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’ জারি হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে এসেছিল ‘সিকিউরিটি অ্যাক্ট’। ১৯৬২ সালে ‘ভারত রক্ষা আইন’ তারপর ‘পিডি অ্যাক্ট’। তারপরে শেষ পর্যায়ে মিসা। বিনা বিচারে আটক করার আইন স্বাধীনতার পর থেকেই পুলিশের হাতে ছিল। এই আইনগুলো করার সময় বলা হত, সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হবে। কিন্তু পরে দেখা গেল, বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেও এই আইন হরেদরে ব্যবহার করা হচ্ছে। আসলে বামপন্থীরা এই আইনের শিকারও হয়েছে দীর্ঘদিন। আর সে কারণেই সিপিএম ক্ষমতায় এসে বিনা বিচারে আটক করার আইন আর চাইছিল না। কিন্তু তাতে প্রশাসনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যায়। দাগি-লুটেরাকে ধরলেও ১০-১৫ দিন পরে সে আদালত থেকে জামিন পাবে। তারপর মামলায় আসতে ছয় মাস। নিষ্পত্তি ছয় বছরে হলে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আর এই মধ্যবর্তী সময়ে অপরাধী অবাধেই আরও সমাজবিরোধী কাজ চালিয়ে যায়। কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে অপরাধ জগতের সহাবস্থান তৈরি হয়ে যায়। বড় অপরাধ, দলবদ্ধ অপরাধ, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, জুয়া, রাহাজানি – এই সমস্ত আটকানোর দায়িত্ব ছিল পুলিশের।
নিষ্পত্তি ছয় বছরে হলে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আর এই মধ্যবর্তী সময়ে অপরাধী অবাধেই আরও সমাজবিরোধী কাজ চালিয়ে যায়। কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে অপরাধ জগতের সহাবস্থান তৈরি হয়ে যায়। বড় অপরাধ, দলবদ্ধ অপরাধ, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, জুয়া, রাহাজানি – এই সমস্ত আটকানোর দায়িত্ব ছিল পুলিশের।
জ্যোতি বসু নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সেই সময় পুলিশ কমিশনার নিয়ে মাথা ঘামাননি বলে অভিযোগ উঠত। এদিকে পুলিশের সংগঠন চাকরির উন্নতি অধিকার নিয়ে সরব হয়ে গিয়েছে। আইপিএস অ্যাসোসিয়েশন (ইন্ডিয়ান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন) ছিলই। তারপর সিপিএম আমলে নন-গেজেটেড পুলিশ কর্মচারী সমিতি তৈরি হয়েছিল। এখন আর সেই সংগঠন নেই। বিধান রায় শীর্ষস্তরের পুলিশের মাথাভারী সংগঠন করেননি। কম সংখ্যক অফিসার দিয়ে নিচুতলার পুলিশকর্মী বেশি রেখে কাজ করার চেষ্টা করতেন। ’৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার আসার পর শুরু হল পুলিশ বাহিনীতে প্রোমোশন। আর নতুন নতুন পদ সৃষ্টির মহোৎসব।
ড. রায়ের আমলে ছিল একজন আইজি আর পাঁচজন ডিআইজি। জ্যোতিবাবুর সময় হল আইজির উপরেও একটা পদ। নাম হল ‘ডিরেক্টর জেনারেল’। জ্যোতিবাবুর সময় পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের উপরতলায় দু’জন ডিরেক্টর জেনারেল, দু’জন ইন্সপেক্টর জেনারেল, সাতজন স্পেশাল আইজি এবং ডিআইজি। ড. রায় পাঁচজনকে নিয়ে চালিয়েছেন। জ্যোতিবাবু ১৯ জন ডিআইজি নিয়ে চালিয়েছেন। রেলের ডিআইজি, সিআইডির ডিআইজি, আর্ম পুলিশের ডিআইজি, কন্ট্রোল অফ সিভিল ডিফেন্স। একজন শুধু কম্পিউটারের ডিআইজি। এখন অবশ্য জনসংখ্যা বেড়েছে। পুলিশের কাজকর্ম বেড়েছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে হয়তো এসব অফিসার নিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।
ড. রায়ের আমলে ছিল একজন আইজি আর পাঁচজন ডিআইজি। জ্যোতিবাবুর সময় হল আইজির উপরেও একটা পদ। নাম হল ‘ডিরেক্টর জেনারেল’। জ্যোতিবাবুর সময় পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের উপরতলায় দু’জন ডিরেক্টর জেনারেল, দু’জন ইন্সপেক্টর জেনারেল, সাতজন স্পেশাল আইজি এবং ডিআইজি।
২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে গুলিচালনার রক্তাক্ত দিন। ফাইল ছবি
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের সঙ্গে দলীয় রাজনীতিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। পুলিশের মধ্যেও দুর্নীতির অনুপ্রবেশ হয়। তারপর তো একটা সময় পশ্চিমবঙ্গের পুলিশও হয়ে উঠল 'ট্রিগার হ্যাপি'! কমিউনিস্ট প্রশাসনে ভোটচরিত্র বদলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠল। এক একটা নির্বাচনে পার্টি-পুলিশ যৌথ প্রশাসন। আর এই পতনের কাহিনি এসে এক চূড়ান্ত রূপ নিল নন্দীগ্রামের গুলিচালনায়। পরিণামগত পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন নিয়ে এল। নন্দীগ্রামের সংকটবিন্দুতে দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হয়ে গেলেন 'ট্র্যাজিক হিরো'।
