উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে প্রার্থীপদের আগাম ইঙ্গিত দিয়ে পার্টির যুব নেতৃত্বের রোষের মুখে মহম্মদ সেলিম। গত লোকসভায় শ্রীরামপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছিলেন দীপ্সিতা ধর। সব থেকে বেশি ভোট পেয়েছিলেন উত্তরপাড়া বিধানসভার অন্তর্গত এলাকায়। সেদিক থেকে এটি অন্য আসনের নিরিখে সিপিএমের তুলনামূলক 'ভালো' আসন। যুব নেতৃত্বের সূত্রে খবর, সেলিম ক'দিন আগেই মীনাক্ষীকে এই আসনে মনোযোগ দিতে বলেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক। এরপরই দেখা যায় মীনাক্ষী অন্য সব কর্মসূচি ছেড়ে কার্যত এখানে ঘাঁটি গেড়েছেন সেখানেই। উত্তরপাড়ায় তাঁর পড়ে থাকা দেখেই অন্য তরুণ নেতাদের ধারণাটা স্পষ্ট হয়। সেলিমের গুডবুকে থাকা মীনাক্ষীকে কেন সব ক্ষেত্রে 'অ্যাডভান্টেজ' দেওয়া হচ্ছে, বাকিদের কেন অন্ধকারে রাখা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দলীয় কর্মসূচিতে ব্যস্ত মীনাক্ষী মুখোপাধ্য়ায়। ফাইল ছবি
'চুপি-চুপি' গোপনে তাঁকে বলে দেওয়া হল 'উত্তরপাড়ায় তুমি দাঁড়াবে'। আর যে ওখানে ভালো লড়াই করেছিল সেই দীপ্সিতাকে রেখে দেওয়া হল অন্ধকারে। তাহলে পার্টি ছেড়ে যাওয়া প্রতীক উর রহমানের মন্তব্যগুলিই কি প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে না! বঙ্গ সিপিএমে এখন তো তাহলে 'প্যারেলাল'-দের খোঁজ চলছে। পার্টিতে এই 'প্যারেলাল' দেরই রমরমা। বাকিরা সেই এককোণে, অন্ধকারে। আর তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের মধ্যেও এই বিভাজন করে দেওয়া হয়েছে পার্টিতে।
প্রসঙ্গত, মীনাক্ষী ফেসবুকে তাঁর পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন। আবার সিপিএমের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও উত্তরপাড়ায় মীনাক্ষীর জনসংযোগ কর্মসূচির প্রচার ছবি-ভিডিও দিয়ে চলছে। বিক্ষুব্ধদের দাবি, দীপ্সিতাই সব থেকে এখানে ভালো প্রার্থী হতে পারত। তার পরিবার সূত্রে এই কেন্দ্রটি হাতের তালুর মতো চেনা। অন্যদিকে, মীনাক্ষী গতবার দাঁড়িয়েছিলেন নন্দীগ্রাম আসনে। সেবার জমানত খোয়ান। এবার যদি দীপ্সিতাকে সরিয়ে মীনাক্ষীকে উত্তরপাড়ায় প্রার্থী করা হয় তবে ভোট যে আরও তলানিতে ঠেকবে তা নিশ্চিত ওই নেতৃত্বের কাছে। আবার পার্টিতে প্রশ্ন, আর্টসের ছাত্রী মীনাক্ষী কীভাবে সায়েন্স ল্যাবের টেকনিশিয়ানের কাজ পেয়েছিলেন? দলে মীনাক্ষীর দ্রুত উত্থান নিয়ে সেই 'প্যারেলাল' প্রশ্নও সামনে এসেছে। এত কম বয়সে কেন্দ্রীয় কমিটিতে মীনাক্ষী জায়গা পাওয়ায় দলের একাংশের মধ্যে চাপা ক্ষোভও রয়েছে। পার্টিতে মীনাক্ষীর দ্রুত উত্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দলের কট্টরপন্থীদের মধ্যেও।
প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও দলের ওই অংশের প্রশ্ন, পার্টির তো অনেক দক্ষ নেতৃত্ব রয়েছেন, যাঁরা মাঠে-ময়দানে কাজ করছেন। তাঁদের কেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না? মীনাক্ষীকে তো পরেও নিয়ে যাওয়া যেত। এত তাড়াতাড়ি গুরুদায়িত্ব কেন? তা ছাড়া নির্বাচনেও মীনাক্ষী উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। মীনাক্ষীর সমসাময়িক ও তার আগে থেকে পার্টিতে থাকা অনেককেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজ্য কমিটির সদস্য হিসেবে সীমাবদ্ধ রেখে দেওয়া হয়েছে। কৌস্তভ চট্টোপাধ্যায়, সায়নদীপ মিত্র থেকে শুরু করে পুরনোরা যেমন রয়েছেন, আবার কলতান দাশগুপ্ত, দীপ্সিতা ধরদের মতো নেতাদের নির্দিষ্ট বৃত্তে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে পার্টির গঠনতন্ত্র মেনে তাঁরা কেউ প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ না করলেও দলের অন্দরে অভিমান রয়েছে তাঁদের। পার্টিতে দম বন্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতীক উর মুখ খুলে দল ছাড়ার পর তরুণ প্রজন্মের অন্য নেতাদের মধ্যেও তার আঁচ যে কোনওদিন পড়তে পারে বলে শঙ্কা এখন সিপিএমের মধ্যেও। এদিকে, কোন্ননগরে দলীয় কর্মসূচিতে এদিন প্রতীক উর প্রসঙ্গে স্মৃতিচারনা করে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেন, "ব্যক্তি প্রতীক উর, কমরেড প্রতীক উর একসঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেডের এপারে দাঁড়িয়ে মার খেয়েছি। প্রতীক উর কে নিয়ে বলার মতো এইমুহুর্তে অতটা মানসিকতা আমি জোগাড় করতে পারিনি।"
