shono
Advertisement
Rajeev Kumar

কেন রাজীবকে রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছেন মমতা? তৃণমূলের অন্দরে চর্চায় চার কারণ

শুধু তৃণমূলের অন্দরমহল বা বিরোধী শিবিরই নয়, প্রশাসনিক মহলেও রাজ্যসভা প্রার্থী মনোনয়নে রাজীবের নাম নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে উঠে আসছে চার কারণ।
Published By: Saurav NandiPosted: 05:29 PM Feb 28, 2026Updated: 06:29 PM Feb 28, 2026

মেলেনি কোনও জল্পনা, কোনও চর্চাই। উলটে সকলকেই বিস্মিত করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! রাজ্যসভার প্রার্থী হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছেন প্রাক্তন পুলিশকর্তা রাজীব কুমারকে। শুক্রবার সন্ধ্যায় এই ঘোষণার পর থেকেই জল্পনার অন্ত নেই রাজনৈতিক মহলে। আলোচনা শুরু হয়েছে তৃণমূল অন্দরেও।

Advertisement

ভারপ্রাপ্ত ডিজি হিসাবে তাঁর মেয়াদ নবান্ন না বাড়ানোয় অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার রাজীবের দুঃসময় শুরু হবে! অবসরজীবন নানা ঝঞ্ঝাটের মধ্যেই কাটাতে হবে তাঁকে। কিন্তু অনুমান যে কতটা ভ্রান্ত ছিল, তা শুক্রবার রাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল।

রাজ্যসভায় তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সাকেত গোখেলের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী এপ্রিল মাসে। আগেই পদত্যাগ করে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন মৌসম বেনজির নূর। এই চার আসনেই নতুন মুখ আনতে চলেছেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। অতীতে বিভিন্ন পেশার পরিচিতদের রাজনীতিতে নিয়ে এসেছেন মমতা। কিন্তু রাজীবের মতো সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এবং 'বিতর্কিত' পুলিশকর্তার মনোনয়ন সাম্প্রতিক অতীতে সব চেয়ে বেশি নজরকাড়া। বাম আমলে নানা সময়ে রাজীবের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন মমতা। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর সেই রাজীবই ধীরে ধীরে মমতার 'আস্থাভাজন' হয়ে ওঠেন। সারদা কাণ্ডের শোরগোলের সময় তাঁকে 'আমার সেরা অফিসার' আখ্যাও দিয়েছিলেন মমতা। শুধু তা-ই নয়, সারদা কাণ্ডের তদন্তে রাজীবকে সিবিআই জেরা করতে এলে ধর্মতলায় সপার্ষদ ধর্নাতেও বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরবর্তীকালে এই দুঁদে পুলিশকর্তার রাজ্য ও কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ পেরিয়ে রাজ্য পুলিশের ডিজি-ও হন। কিন্তু অবসরের পর তাঁকে মমতার রাজ্যসভার পাঠানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক শিবিরের বড় অংশই কল্পনা করতে পারেনি!

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহে রাজ্য প্রশাসন তো বটেই, তৃণমূলের অন্দরেও অনেকে বলতে শুরু করেছিলেন, রাজীব সম্ভবত আর আগের মতো মমতার 'আস্থাভাজন' নন। যুবভারতী কাণ্ডের পর তাঁকে প্রকাশ্য বৈঠকে তিরস্কারও করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনাচক্রে, তার কিছু দিন পরেই রাজীবের অবসরের সময় চলে আসে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত ডিজি হিসাবে তাঁর মেয়াদ নবান্ন না বাড়ানোয় অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার রাজীবের দুঃসময় শুরু হবে! অবসরজীবন নানা ঝঞ্ঝাটের মধ্যেই কাটাতে হবে তাঁকে। কিন্তু অনুমান যে কতটা ভ্রান্ত ছিল, তা শুক্রবার রাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল। শুধু তৃণমূলের অন্দরমহল বা বিরোধী শিবিরই নয়, প্রশাসনিক মহলেও রাজ্যসভা প্রার্থী মনোনয়নে রাজীবের নাম নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে উঠে আসছে চার কারণ।

প্রথমত, সারদা মামলা তো বটেই, সম্প্রতি আইপ্যাক কাণ্ডেও রাজীবের নাম জড়িয়েছে। ঘটনাচক্রে, এই দুই মামলাতেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত তুঙ্গে ওঠে। তাই চাকরিজীবন থেকে অবসরের পর অনেকেরই আশঙ্কা ছিল, রাজীব হয়তো এবার কেন্দ্রীয় সরকারের রোষে পড়বেন। আইপিএস অফিসার এবং রাজ্যের ডিজি পদে থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে এতদিন যে পদক্ষেপ করা সম্ভব হয়নি, অবসরের পর এবার তাঁর বিরুদ্ধে সেই সব পদক্ষেপই করা হতে পারে। সে দিক দেখলে নিরাপত্তার প্রয়োজন ছিল রাজীবের। তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হলে সে রকমই কিছু নিরাপত্তা পাবেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করতে হলে সংসদের নিয়মকানুন মেনেই করতে হবে, যা ততটাও সহজ হবে না।

সম্প্রতি রাজীব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। এই ঘটনাকেই দ্বিতীয় কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁদের মত, রাজীবের মামলা যতটা না মানহানির ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি 'রাজনৈতিক'। কারণ, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এভাবে মামলা করা এতটাও সহজ নয়, যদি না পিছনে কোনও 'সাপোর্ট' থাকে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলার অর্থ আদতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই মামলা। তৃণমূলের মতো দলের সাংসদ হলে সমানে সমানে টক্করের জায়গা পাবেন রাজীব। মমতা তাঁকে সেই জায়গাই তৈরি করে দিলেন।

প্রশাসনিক মহলে তৃতীয় একটি কারণ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তা হল, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে পারবেন রাজীব। প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের দাবি, রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা নিয়ে রাজীবের কাছে বিস্তর 'ইন্টেল' রয়েছে। তাঁর নানা গোপন সূত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সীমান্ত এলাকায়। সংসদে গিয়ে এ সব বিষয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সমন্বয়ের কাজ অনায়াসে করতে পারে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল, তাঁর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের 'সুসম্পর্ক'। শুধু তা-ই নয়, তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়েও রাজীব ভীষণই পারদর্শী। সে সব ব্যাপারে তাঁর মতামতও নিতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। জাতীয় স্বার্থে রাজীবকে কাজে লাগানো গেলে বাকি দিকগুলিতেও ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে 'উন্নতি' হলে আদতে উপকৃত হবেন বাংলার সাধারণ নাগরিকেরাই।

চতুর্থত, তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, রাজীবকে সংসদে পাঠিয়ে এ রাজ্যের অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকদেরও বার্তা দিলেন মমতা। তাঁদের যুক্তি, বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের 'চাপে' এ রাজ্যের অনেক উচ্চপদস্থ আধিকারিকই 'ভীত'। তাঁদের অনেকের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও চলেন, যা মমতার সরকারের কাছে যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ। এই পরিস্থিতি রাজীবকে সংসদে পাঠিয়ে আসলে বার্তা দেওয়া হল যে, 'চাপের' মুখে নতিস্বীকারের প্রয়োজন নেই। ভালো কাজ করে গেলে রাজ্য সরকার 'নিরাপত্তা'র ব্যবস্থা করবে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement