গ্রামে তাঁকে দাদু বলেন সকলেই! এবার তাঁর কাজেই চমকে গেল বাংলা! বৃদ্ধ অনিল বেরার হাতের তৈরি যন্ত্রে অসাধ্য সাধন ঘটল কলকাতার মেডিক্যাল কলেজে। ‘কঠিন’ অস্ত্রোপচারের জন্য ‘যন্ত্র’ বানিয়ে তাক লাগালেন মেকানিক, চলতি ভাষায় কলমিস্ত্রি, চাষের কাজে ব্যবহৃত সেলো মেশিনের খুটিনাটি সারান তিনি! পায়ে বসানো ভেঙে যাওয়া রডের টুকরো বেরল ৭৫ বছর বয়সের ওই মেকানিকের তৈরি যন্ত্রে! শুনে অবাক হচ্ছেন তো?
এমনই এক চমকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ওই হাসপাতালের অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সৈকত সাউয়ের উপস্থিত বুদ্ধিতেই হয়েছে এই কাজ।! দাবি, হাওড়ার বনগ্রামের বাসিন্দা সুকুর আলি মোল্লা নামের এক রোগীর ডান পায়ে থাকা টুকরো টুকরো ‘রড’ হ্যান্ডমেড ওই যন্ত্র দিয়েই বের করেছেন চিকিৎসকেরা। আর সেই ৩ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে কাজে লেগেছে অনিল বেরার তৈরি ওই যন্ত্র।
ঠিক কী হয়েছে আসলে? হাসপাতাল সূত্রে খবর, ২০১৬ নাগাদ আগে ডান পায়ের উরুর অংশের হাড় ভাঙে সুকুর আলির। তারপর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেখানে বসানো হয় নেইল আর স্ক্রু। যাকে চলতি ভাষায় বলা হয় রড। কিন্তু মুম্বইয়ে কাজে গিয়ে ফের শুরু হয় পায়ের যন্ত্রণা। পরে কলকাতায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা যায়, কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত বসানো ওই রড ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। ফের প্রয়োজন হয় অস্ত্রোপচারের! কিন্তু এই অবস্থায় সমস্যা তৈরি করে এক বিশেষ যন্ত্র। যাকে বলা হয়, ‘ব্রোকেন নেইল টিপ রিমুভার’। যে যন্ত্র সরকারি হাসপাতালে প্রায় দুর্লভ! ভাড়ায় পাওয়া গেলেও খরচ হয় বেশ কয়েক হাজার টাকা।
চিকিৎসক সৈকত সাউয়ের সঙ্গে অনিল বেরা। নিজস্ব চিত্র।
এখানেই মুশকিল আসান করে ফেলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অস্থিরোগ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডাঃ সৈকত সাউ। আচমকা তাঁর মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। গ্রামের বাড়ির এক বৃদ্ধ কলমিস্ত্রির কাছে সটান হাজির হন তিনি। তাঁর সেই ‘অনিলদাদু’কে গিয়ে তিনি বলেন, এমন যন্ত্র বানানো সম্ভব কিনা! যেমন বলা তেমন কাজ, পোড় খাওয়া ওই মেকানিক তৈরি করে ফেলেন ‘টিপ রিমুভারে’র মতো এক যন্ত্র। আর সেই যন্ত্রেই কিস্তিমাত! হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের বাসিন্দার হাতের ছোঁয়ায় আশ্বস্ত হন চিকিৎসক স্বয়ং। ওই যন্ত্রকে বিশেষ মেডিক্যাল পদ্ধতিতে জীবানুমুক্ত করে গত মঙ্গলবার চলে দীর্ঘ অস্ত্রোপচার। বের করা হয় ভাঙা রডের টুকরো। ফের নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অন্য যন্ত্র দিয়ে নতুন করে বসানো হয় রড। দামি নেইল, স্ক্রুর সাহায্যে ‘ফিক্স’ করা হয় উরুর হাড়। ইতিমধ্যেই ছুটি পেয়েছেন ওই রোগী। ফিরেছেন বাড়িতেও।
অস্ত্রোপচারের পরে চিকিৎসকেরা। নিজস্ব চিত্র।
চাপা টেনশন কাটতেই এমন বিস্ময়কর ঘটনায় স্বস্তি পান চিকিৎসক সৈকত সাউ। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে তিনি বলছেন, ছোটবেলায় দেখতাম মেকানিক হিসেবে চাষের জমিতে জল দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র সারিয়ে ফেলতেন অনিল বেরা, তাঁকে অনিলদাদু বলা হয় এলাকায়। মনে হল চটজলদি যদি কিছু করা যায়। তাঁকে বললাম। দেখালাম, বর্ণণা দিলাম ওই যন্ত্রের। সমস্যার সমাধান হয়েছে। এই ঘটনায় খুশি সুকুর আলির নিজেও। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি জানান, ‘আমি কৃতজ্ঞ। অনিলবাবুকেও কল করেছিলাম। ডাক্তারবাবুর প্রতি কী বলব, আমি আপ্লুত। সকলকে ধন্যবাদ। ভালো আছি।’ কিন্তু কী বলছেন অনিল বেরা? তাঁর পুত্র প্রণব বেরার দাবি, ‘বাবা ডাক্তারবাবুর (সৈকত সাউ) সঙ্গে কথা বলে একাজ করেছেন। এই বয়সে তাঁর এই কাজ আমাদেরও গর্বিত করেছে। বাবাও খুব উৎসাহ পেয়েছেন।’
