shono
Advertisement
Mamata Banerjee

ইন্দিরা পেরেছিলেন, রাজপাট-দল সব হারিয়ে 'নিঃস্ব' মমতা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন?

মমতার আরও বড় সমস্যা হল, ইন্দিরা যে আদর্শ এবং উত্তরাধিকারকে পুঁজি করে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন, সেটা মমতার কাছে নেই। তাছাড়া ইন্দিরা একনায়কের মতো দল চালালেও তাঁর আমলে কোনও সময়ই কংগ্রেস 'প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি' হয়ে যায়নি।
Published By: Subhajit MandalPosted: 06:22 PM Jun 28, 2026Updated: 06:22 PM Jun 28, 2026

ইন্দিরা গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে সফল মহিলা রাজনীতিকদের তালিকা তৈরি করতে গেলে সর্বাগ্রে যাঁদের নাম উচ্চারিত হবে, সেই তালিকায় নিঃসন্দেহে এই দু'জন থাকবেন। দু'জনের রাজনৈতিক জীবনেও অসম্ভব মিল রয়েছে। নিজেদের রাজনৈতিক জীবনে দুই মহিলাই হাজারো প্রতিবন্ধকতা কাটিয়েছেন। দু'জনেই অসম্ভব সফল এবং প্রভাবশালী। আবার অপত্য স্নেহ দু'জনকেই চরম বিপাকে ফেলেছে। ইন্দিরাকে ভুগতে হয়েছে পুত্র সঞ্জয়ের জন্য, মমতাকে ভুগতে হচ্ছে ভাইপো অভিষেকের জন্য। একটা সময় ইন্দিরাও সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন, এমনকী নিজের দল থেকেও বরখাস্ত হতে হয়েছিল। আজ কার্যত একই পরিস্থিতিতে মমতাও। এখন প্রশ্ন হল, ওই খাদের কিনারা থেকে যেভাবে লড়াই করে ইন্দিরা কামব্যাক করেছেন- সেটা কী মমতাও পারবেন?

Advertisement

বস্তুত মমতার জন্য লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন। আসলে হারের দু’মাসের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুরোপুরি রাজনৈতিক ভাবে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছেন। প্রায় হাতছাড়া দল। যাঁদের সাংসদ, মন্ত্রী, মেয়র, চেয়ারপার্সন, বিধায়ক বানিয়েছিলেন, তাঁদের সিংহভাগ সঙ্গে নেই।

ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৬৯-এ। আবার ১৯৭৭-এর নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর নতুন দলেও বিদ্রোহের মুখে পড়েছিলেন ইন্দিরা। দু'বারই তিনি কামব্যাক করেন। ১৯৬৯ সালে প্রথমবার কংগ্রেসের শক্তিশালী 'সিন্ডিকেট' নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন ইন্দিরা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী নীলম সঞ্জীব রেড্ডির পরিবর্তে তিনি সমর্থন করেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি ভিভি গিরিকে। তিনি সাংসদ ও বিধায়কদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত ভিভি গিরির জয় হয়। এরপর কংগ্রেস সভাপতি এস নিজালিঙ্গাপ্পা ইন্দিরা গান্ধীকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয় কংগ্রেস (আর) এবং কংগ্রেস (ও)। দলীয় বিরোধিতার মুখে পিছিয়ে না গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে সাধারণ মানুষের নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে 'গরিবি হটাও' স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি কার্যত ব্যক্তিগত লড়াইয়ে নেমে পড়েন। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস (আর) বিপুল জয় পায়। ১৯৭৮ সালে ফের দল হারান ইন্দিরা। জরুরি অবস্থার পর নিজের আলাদা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে ফের বহিষ্কার করে কংগ্রেস। সেবার ইন্দিরা গড়েন কংগ্রেস (আই)। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস (আই) ক্ষমতায় ফিরে আসে। ইন্দিরার এই জোড়া কামব্যাকের একাধিক অস্ত্র ছিল। এক, ইন্দিরার আয়রন লেডি ভাবমূর্তি। দুই, সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা। তিন মানুষের মধ্যে নেমে গিয়ে কাজ করার প্রবণতা। চার, অপত্য স্নেহ পরিত্যাগ করে, সঞ্জয় গান্ধীর ক্ষমতা হ্রাস, এবং সঞ্জয়ের অকালমৃত্যু। নেতা নির্ভরতা পেরিয়ে আমজনতার উপর আস্থা রাখা। আসলে জনপ্রিয়তার মধ্যে বরাবরই জনপ্রিয় ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।

ইন্দিরা গান্ধী। ফাইল ছবি।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, যে মন্ত্রে ইন্দিরা গান্ধী কামব্যাক করেছিলেন, সেই একই মন্ত্রে মমতা কামব্যাক করতে পারবেন কী? বস্তুত মমতার জন্য লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন। আসলে হারের দু’মাসের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুরোপুরি রাজনৈতিক ভাবে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছেন। প্রায় হাতছাড়া দল। যাঁদের সাংসদ, মন্ত্রী, মেয়র, চেয়ারপার্সন, বিধায়ক বানিয়েছিলেন, তাঁদের সিংহভাগ সঙ্গে নেই। এমনকী, যাঁদের ছায়ার মতো ভরসা করতেন সেই ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাসরাও সঙ্গে নেই। শীর্ষস্তর থেকে একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত যেখানেই মমতা যাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন- প্রত্যেকে আজ তাঁর বিরোধী শিবিরে। কেউ-ই যেন নেত্রীর উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। মমতা এবং ইন্দিরার মূল তফাৎ হল, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ ছিল, তার সবটাই রাজনৈতিক। সরাসরি আর্থিক দুর্নীতি বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাছাড়া ইন্দিরার সঙ্গে কংগ্রেসি আদর্শ এবং নেহরুকন্যা হওয়ায় পারিবারিক উত্তরাধিকার ছিল- যা তখনও বহু মানুষকে আকৃষ্ট করত।

মমতার সমস্যা হল, তাঁর প্রায় গোটা দলের বিরুদ্ধে আদ্যপান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার ট্যাগ লেগে গিয়েছে। একটা সময় তাঁর নিজের ভাবমূর্তি ছিল সততার প্রতীক, অগ্নিকন্যা। আজ সেসব আর কেউ বলেন না। বরং সোশাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে এমন কিছু আলোচনা হয়- যা এখানে না বলাই সমীচিন। মমতা জমানায় যারা মন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের বিপুল সম্পত্তি, কারও বান্ধবীর বাড়িতে কাড়ি কাড়ি টাকা, কারও বান্ধবীর বাড়িতে সোনার খনি। শুধু মন্ত্রীরা কেন, একেবার তৃণমূল স্তরের নেতা, কাউন্সিলর-পঞ্চায়েত সদস্যদেরও কেউ কেউ কোটিপতি- কেউ কেউ লাখপতি। প্রায় প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'স্বচ্ছ্ব' ভাবমূর্তি এখন পুরোদস্তুর প্রশ্নের মুখে। এটা ঠিক, এখনও মমতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি। কিন্তু তাঁর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের সম্পত্তির ‘অস্বাভাবিক বৃদ্ধি’ নিয়ে ইতিউতি প্রশ্ন ওঠা শুরু করেছে।

একুশের সভায় মমতা। ফাইল ছবি।

ইন্দিরার জরুরি অবস্থার সময় ভয়ের পরিবেশ ছিল। কিন্তু সেটা ছিল প্রশাসনিক স্তরে। কিন্তু তৃণমূলের আমলে জাহাঙ্গির, শাহজাহান, শওকত মোল্লাদের মতো নেতারা নিজেদেরই ভয় এবং আতঙ্কের প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছিলেন। প্রত্যেকের নিজেদের এলাকায় যেন নিজেরাই রাজত্ব চালাতেন। সব দেখেও না দেখার ভান করেছেন মমতা। এইসব এলাকায় পুলিশকেও যেন অসহায় মনে হত। এসব মানুষের স্মৃতি থেকে ভোলানো সহজ নয়।

মমতার আরও বড় সমস্যা হল, ইন্দিরা যে আদর্শ এবং উত্তরাধিকারকে পুঁজি করে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন, সেটা মমতার কাছে নেই। তাছাড়া ইন্দিরা একনায়কের মতো দল চালালেও তাঁর আমলে কোনও সময়ই কংগ্রেস 'প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি' হয়ে যায়নি, যে অভিযোগটা খেটে যায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে। আরও বড় সমস্যা হল মমতা যে পরাস্ত সেটা তিনি নিজে মানতে নারাজ। এখনও পর্যন্ত হার স্বীকার করেননি। এমনকী মামলাও ঠুকেছেন ফলাফলের বিরুদ্ধে। সমস্যা হল, হারই যদি স্বীকার না করা হয়, তাহলে আত্মসমালোচনার সুযোগটাই থাকে না। মমতারও সেই সুযোগ নেই। ফলে তিনি এখনও নিজের ভাইপোকে 'আড়াল' করতে ব্যস্ত। ইন্দিরা যেখানে জরুরি অবস্থার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন, সেখানে মমতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পদ থেকে পর্যন্ত সরাননি।

আসলে তৃণমূল দলটা পুরোটাই মমতা কেন্দ্রিক। মমতার আদর্শ-ভাবমূর্তিই দলের আদর্শ ও ভাবমূর্তি। সমস্যা হল, গত ১৫ বছরে মমতা নিজের ভাবমূর্তিটাই হারিয়ে ফেলেছেন। ভুলে গেলে চলবে না তিনি নিজেও দু'বার পরাজিত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। ফলে ভাবমূর্তিহীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা খুব কঠিন। আরও একটা বড় সমস্যা হল তৃণমূল সুপ্রিমোর বয়স। ইন্দিরা যখন দলচ্যুত হন, তখন মমতার চেয়ে অনেকটাই কম বয়সি ছিলেন তিনি। ৭৭ বছর বয়সি তৃণমূল সুপ্রিমোর পক্ষে লড়াইটা তাই আরও কঠিন। কিন্তু তা বলে মমতাকে এখনই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়াটাও বোধ হয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। রাজনীতিতে কাউকেই বাতিলের খাতায় ফেলাটা বোকামি। ভুলে গেলে চলবে না, এই প্রবল জনরোষের নির্বাচনেও তৃণমূল ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও অতীতে বহু কামব্যাকের গল্প লিখেছেন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement