পুজো প্রায় এসেই গেল৷ পাড়ায় পাড়ায় পুজোর বাদ্যি বেজে গিয়েছে৷ সেরা পুজোর লড়াইয়ে এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়৷ এমনই কিছু বাছাই করা সেরা পুজোর প্রস্তুতির সুলুকসন্ধান নিয়ে হাজির Sangbadpratidin.in৷ আজ পড়ুন এসবি পার্ক সর্বজনীনের পুজো প্রস্তুতি৷
সরোজ দরবার: আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছাকে বরাবরই দূরে সরিয়ে রাখার কথা বলেন মহাজনরা। বরং মন দেওয়া উচিত কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছায়। সেটাই প্রেম। পদাবলীর এ কথা যদি ইতিহাসের আয়নায় ফেলি তবে দেখব, এ প্রেমই আসলে হাত হাত রেখে একদিন যৌথখামার গড়ায় প্ররোচনা দেয়। ক্ষুদ্র স্বার্থ অতিক্রম করে বৃহত্তর অঙ্গীকারের আগুনে হাত সেঁকে নেওয়ার কথা বলে। বলে গণ্ডি ভাঙার কথা। নিজেকে প্রীত করার বাইরে এক বৃহৎকে আলিঙ্গন করার এ ডাক বারেবারে এসেছে। মানুষ কামনা করেছে ‘ভাঙে যেন জানলার গারদ সবার’। কিন্তু কখনও কখনও সময়ের ছলনা এমনই যে, সে ডাক রুদ্ধ হয়ে পড়ে। মানুষ মজে যায় সেই নিজেকে নিয়েই। যার পোশাকি নাম হতে পারে ‘সেলফি’। দুর্গাপুজোর মতো একটা মঞ্চে এবার এই আত্মকেন্দ্রিকতার বেড়া ভাঙার স্বপ্ন নিয়ে হাজির শিল্পী ভবতোষ সুতার, এসবি পার্ক সর্বজনীনে।
[ বন্ধন মুক্তির আহ্বানেই মায়ের আবাহন হাতিবাগান সর্বজনীনে ]
[ ‘শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’য় মায়ের আরাধনায় মাতবে দমদম পার্ক ভারত চক্র ]
কনজিউমারিজমের প্রবল দাপট গোটা বিশ্বেই। রাশিয়ার দুর্গ ভেঙে পড়েছে, সে চিনও আর নেই। ফলে একদিন যে লাল স্বপ্ন সাম্যের নিশান বিশ্ব জুড়ে দেখতে চেয়েছিল, তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর সেই রন্ধ্রপথেই লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে ভোগবাদের সোনাঝুরি। আষ্টেপৃষ্টে সে জড়িয়ে ধরে এ সভ্যতার কাণ্ডকে। সোনালি মায়া বিলিয়ে সে শোষণ করে সভ্যতার রস। আর আমরা দিনে দিনে হয়ে উঠি তার বশংবদ। এ যদি না হয় তবে সেলফির ফাঁদে কী করে মজে গেল একটা প্রজন্ম? এত নার্সিসিজম, এত আত্মকেন্দ্রিকতা কোথা থেকে গ্রাস করল প্রজন্মের পর প্রজন্মকে? এই বাস্তবতা ভাবিয়েছে শিল্পী ভবতোষ সুতারকে। আর পুজোর মঞ্চে সেই আত্মকেন্দ্রিকতা ভেঙে বেরনোর একটা প্রচ্ছন্ন ডাকই তিনি দিচ্ছেন তাঁর কাজে। এসবি পার্ক সর্বজনীনের থিমের পোশাকি নাম ‘সেলফি’। বলা ভাল এ হল আসলে আত্মদর্শন। শিল্পী ভবতোষ দর্শনার্থীদের ফাইবারের ফড়িংয়ের পাখায় পাখায় ফ্যান্টাসিতে শীর্ষে তোলার আয়োজন করেছেন। কিন্তু যে জীবন দোয়েলের, ফড়িঙের তার দেখা কি সেলফি ক্যামেরায় চোখ রেখে মেলে? মেলে না। মেলে না বলেই আমাদের তাকানো উচিত নিজেদের দিকে। আমাদের অন্তরাত্মারও যেন স্ক্যানের প্রয়োজন হয়েছে। ভবতোষের মণ্ডপে সাজানো চেয়ারে তাই স্ক্যানের প্লেট। আসলে তো দরকার ছিল ব্যক্তিত্ব বা ‘সেলফ’। বদলে সেলফির পাতা ফাঁদে আমাদের পা। শিল্পী এখানে পরিষ্কার দেখিয়ে দিতে চান, মা যা ছিলেন আর মা যা হয়েছেন। অর্থাৎ আমাদের কী হওয়ার কথা ছিল, আর আমরা কোথায় পৌঁছেছি।
নিঃসন্দেহে অভিনব ভাবনা। কনটেম্পোরারিও বটে। প্রস্তুতির ঝলকে তার একজিকিউশনও চমকে দেওয়ার মতো। আর গতবারের মতো এবারও এই থিমের সঙ্গে মানানসই সংগীত সৃজন করেছেন কবীর সুমন। ‘পাক খেতে খেতে সটান উপরে আমার আসন…’- সেই আত্মকেন্দ্রিকতার চক্রব্যূহের দিকেই আঙুল বাঙালির মননজগতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়া মানুষটির। থিমের ঘনঘটায় দুর্গাপুজো এখন অনেকটাই শিল্পের শোকেসে পরিণত হয়েছে। সেই ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীদের একটি ভাবনার রসদ দিয়েছেন শিল্পী ভবতোষ সুতার ও কবীর সুমন। বাকিটা অবশ্যই দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত।
দেখুন প্রস্তুতির ভিডিও:
The post পুজোয় ‘সেলফি’র ফাঁদ কেটে বেরনোর ডাক এসবি পার্ক সর্বজনীনে appeared first on Sangbad Pratidin.
