shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

পার্টির ৫ হাজার টাকা ভাতাতেই চলে জীবন, জঙ্গলমহল বান্দোয়ানে লালপার্টির প্রার্থী সেই রথু সিং সর্দার

একসময়ে মাওবাদীদের টার্গেট রথুর 'সারথী' মোটরবাইক, তাতে চড়েই রোজ ১০০ কিলোমিটার ঘুরে প্রচার চালাচ্ছেন।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 12:28 PM Mar 21, 2026Updated: 01:24 PM Mar 21, 2026

কংগ্রেস আমলে পুলিশ ও বনদপ্তরের জুলুম সামলেছেন। সেই থেকেই তিনি প্রতিবাদী। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধি, কিষাণ আন্দোলনে গিয়ে পুলিশি খাতায় 'চুরি'র তকমা পান। যদিও নাবালক হওয়ায় সেই মামলা থেকে আদালত বেকসুর খালাস করে তাঁকে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাজনীতির গণ্ডিতে পা। পরে ধাপে ধাপে উত্তরণ। নিম্নবিত্ত পরিবারের সেই কমরেড রথু সিং সর্দারই জঙ্গলমহল বান্দোয়ানে এবার লালপার্টির বাজি। ছাব্বিশের ভোটে (West Bengal Assembly Election) এই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী রথু সিং সর্দার। এখনও পার্টির দেওয়া ৫ হাজার টাকা ভাতায় যিনি জীবন চালান।

Advertisement

প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই রথু সিং সর্দার নিজের মোটরবাইকে চড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিমি জার্নি করছেন। পার্টি কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা থেকে শুরু করে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে ভোট চাইছেন। রাজনীতিতে যখন ট্রেন্ডিং দামি জুতো থেকে পাঞ্জাবি, মোবাইল থেকে চার চাকার গাড়ি, সেখানে রথুর 'সারথী' একটি মোটরবাইক মাত্র। ভোটের বাজারে জঙ্গলমহলে তিনি এক ব্যতিক্রমী চরিত্র।

বান্দোয়ানের সিপিএম প্রার্থী রথু সিং সর্দার জঙ্গলমহলের ভোটচিত্রে ব্যতিক্রমী। নিজস্ব ছবি

বান্দোয়ান ব্লকের কুমড়া অঞ্চলের সারগা গ্রামে জন্ম। সেখান থেকেই বেড়ে ওঠা। চাষাবাদ ও পশুপালন পরিবারের এক মাত্র উপার্জন। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর সংসারে স্ত্রী ছাড়া এক ছেলে দুই নাতিকে নিয়ে বসবাস। মাটির ঘর থেকে সদ্য পাকা ছাদ করেন। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কংগ্রেসের অত্যাচার থেকে ১৯৭৭ সালে রাজনীতিতে যোগ। ১৯৮৪ সালে পার্টির সদস্য। প্রথমে শাখা কমিটি, শাখা সম্পাদক তারপর লোকাল কমিটির সদস্য থেকে সম্পাদক। সেখান থেকে জোনের সদস্য হয়ে সম্পাদক। পার্টির প্রতি তাঁর ত্যাগ, নিষ্ঠা দেখে তাঁকে জেলা কমিটিতে স্থান দেয় দল।

শুধু তাই নয়, গত আড়াই বছর ধরে জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রথু সিং সর্দার। পাশাপশি ওই বিধানসভায় তিনি আহ্বায়কও। বর্তমানে পার্টির সর্বসময়ের কর্মী। তাই দল থেকে মাসিক সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা সাম্মানিক পান। তিনি দলের টিকিটে নির্বাচন লড়ে ৩ বারের পঞ্চায়েত সদস্য, একবারের পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ হয়েছেন। এছাড়াও দুটি স্কুলে পরিচালক সমিতির সভাপতিও হয়েছিলেন রথু। তবে তাঁর লাইম লাইটে আসা বামফ্রন্ট সরকারের শেষদিকে। ওই সময় জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার বান্দোয়ান এলাকায় অতি বামপন্থী এমসিসি ও মাওবাদীদের হাতে খুন হন ১২ জন দলীয় সদস্য। যাঁর মধ্যে ছিলেন তৎকালীন জেলা পরিষদের সভাধিপতি রবি কর ও তার স্ত্রী আনন্দময়ী কর। প্রশাসনিক ও দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয় মাওবাদীদের রুখতে হবে। আর যাতে কোনও ভাবেই বান্দোয়ানে রক্তপাত না ঘটে।

তারপর সিপিএম-এর পরিকল্পনায় মাওবাদী দমনে গ্রামে গ্রামে সেন্দ্রা কমিটি গঠন হয়। কিন্তু সেই কমিটিতে নেতৃত্ব দেবে কে? নাম উঠে আসে লড়াকু নেতা রথু সিংয়ের। ২০০৮ সালে সর্বদলীয় ভাবেই নেতৃত্ব দেন তিনি। রথুর কথায়, "প্রায় নিজেদের এবং এলাকাকে সুরক্ষিত রাখতে স্থানীয় ১ হাজার মানুষ একত্রিত হন। পুলিশ থেকে আত্মরক্ষার জন্য স্রেফ লোহার বল্লভের ব্যবস্থা করে। পরে ট্র্যাডিশনাল অস্ত্র হিসাবে তির-ধনুকের ব্যবস্থা করি। মাওবাদীদের বন্দুকের মোকাবিলায় তির-ধনুক নিয়ে কীভাবে বাঁচতে হবে তার জন্য গ্রামে গ্রামে আত্মরক্ষার পাঠ দেওয়া হয়। শুরু হয় গ্রাম রক্ষা ও রাত পাহারার কাজ।" যার ফলে ওই এলাকায় মাওবাদীরা চাপে পড়ে যায়। তবে টার্গেট হয়ে পড়েন রথু। ২০০৮ সালে একদিন বান্দোয়ান থেকে দলীয় কাজ সেরে মোটরবাইক নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে শংকর ডুঙরির কাছে তাঁকে লক্ষ্য করে মাওবাদীরা গুলি চালায়। তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় বরাতজোরে তিনি বেঁচে যান। তবে প্রতিরোধ থামেনি। যার ফলে শেষমেশ মাওবাদী মুক্ত হয়ে যায় বান্দোয়ান।

'সারথী' এই মোটরবাইক নিয়েই রোজ প্রচারের জন্য ১০০ কিলোমিটার যাতায়াত করছেন রথু সিং সর্দার। নিজস্ব ছবি

রথুর কথায়, "ওই সময় যে কোনওদিন আমি খুন হয়ে যেতে পারতাম। একবার ভেবেছিলাম লাইসেন্স প্রাপ্ত বন্দুক রাখব। তবে আর্থিক অনটনের কারণে তা আর হয়নি।" আসন্ন নির্বাচনে জয় নিয়ে তিনি আশাবাদী। তাই প্রার্থী পদ ঘোষণার পর থেকেই দল থেকে পাওয়া জ্বালানির টাকায় নিজের মোটরবাইক নিয়েই গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন তিনি। পরিবারের জানিয়েছে, সকালে ঘুম থেকে উঠে দু' ঘণ্টা বাড়িতে থাকেন। স্নান সেরে স্ত্রী কিংবা নিজের হাতে তৈরি লাল চা খেয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এটাই তাঁর এখন রোজনামচা। মাঝপথেই খাওয়া। সারাদিন দলীয় কাজ করে বাড়ি ফেরেন সেই রাতে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের পরিধান থেকে জীবনযাপন যেখানে আধুনিক, কর্পোরেট। সেখানে উল্ট ছবি রথুর। পায়ে চটি, গায়ে পাঞ্জাবি-পাজামা, গলায় সিপিএমের উত্তরীয় জড়িয়েই মাথায় হেলমেট নিয়ে বাইকে চষে বেড়াচ্ছেন এই বাম প্রার্থী। গ্রামে প্রার্থীর আগমনে অনেকেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন তাঁকে। উত্তরে তিনি জানান, দলীয় ভাবে গাড়ি ও গাড়ির তেল বরাদ্দ হবে বিধানসভা নির্বাচনী তহবিল থেকে। আর তার জন্য পার্টি কমরেডরা অনুদান তুলবেন। কথা বলতে বলতেই ঘাড়ের পিছনে একটা ফোলা মাংসপিণ্ড দেখিয়ে বলেন," এটা দেখছেন? দীর্ঘদিন কাঠের বোঝা নিয়ে চলার ফলে এমন হয়েছে। ছোটবেলায় জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে কুইলাপাল হাটে বিক্রির পর দু'বেলা ভাত জুটত। জীবনে বহু লড়াই করেছি। তবে সব জায়গাতেই জয় হয়েছে। এবার ভোটেও জিতব।"

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement