মাথায় ঝুড়ি ভরে মহুল ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন একটু আগে। ছোট্ট দাওয়ায় ক্লান্ত শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিচ্ছিলেন বৃদ্ধা লক্ষ্মী সর্দার। দশ ফুট বাই দশ ফুটের মাটির বাড়ি। সেখানেই তাঁর দিনযাপন। শুকনো মহুল ফুল বিক্রি করেন। কেজি প্রতি মাত্র পঁয়ত্রিশ টাকা আয় হয় তাতে। সেই সামান্য রোজগারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ভাতা ও খাদ্যসাথী প্রকল্পের রেশনে সংসার চালান বর্তমানে জেল থেকে মুক্ত প্রাক্তন মাওবাদী নেত্রী শোভা সিং সর্দারের মা। দীর্ঘদিন ধরে বুকে কষ্ট চেপে মেয়ের প্রতীক্ষায় দিন কাটিয়েছেন তিনি। আর বহু বছর পর এখন মেয়ে জেলমুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এখন মা-মেয়ে মিলে নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন। নানা অভাব-অভিযোগের মধ্যেও লক্ষ্মীর ভরসা বর্তমান রাজ্য সরকারের উপরেই। একই বিশ্বাস মেয়ে শোভারও। আর তাই তিনি এবার ভোটে (West Bengal Assembly Election) অংশ নিতে চান।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চরম বামপন্থার প্রভাবে একসময় 'বিপ্লবী' হয়ে উঠেছিলেন শোভা। তবে এখন সেই পরিচয় ঝেড়ে ফেলে সাধারণ মানুষের মতো শান্ত, স্বাভাবিক জীবনই চান তিনি। মায়ের সঙ্গে একটি নিরাপদ সংসার গড়ে তোলা এখন তাঁর স্বপ্ন। ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি থানার ভুলাভেদা অঞ্চলের মাজুগোড়া গ্রামের এক সাধারণ কিশোরী। মাত্র বারো-তেরো বছর বয়সে অত্যাচারের পরিবেশে বাধ্য হন গ্রাম ছাড়তে। এরপর মাওবাদী স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দাপুটে মাওবাদী নেত্রী। অচিরেই নামটি ছড়িয়ে পড়ে - শোভা সিং সর্দার ওরফে চন্দনা সিং। প্রায় পাঁচ বছর স্কোয়াডে থাকার পর একটি মামলায় ২০১০ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এরপর দীর্ঘ পনেরো বছর সংশোধনাগারে কাটাতে হয় তাঁকে। তিনি জামিনে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে গত বছর জুলাই মাসে ফিরেছেন নিজের গ্রামে।
নিজের বাড়ির দাওয়ায় প্রাক্তন মাওবাদী নেত্রী শোভা সিং সর্দার। নিজস্ব ছবি
আজ ৩৩ বছর বয়সি শোভার কথায় আক্ষেপের সুর। আসলে গত ১৫ বছরে জঙ্গলমহলের গ্রামগুলো তো আমূল বদলে গিয়েছে। এখন জীবনের মূল্যবান সময়গুলো হারানোর কষ্ট তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। সেই সয়ম পড়াশোনা না করতে পারা, শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত হওয়া - সবকিছুর জন্য বড় কষ্ট হয়। শোভা জানাচ্ছেন, যখন তিনি গ্রাম ছেড়েছিলেন, তখন এলাকায় রাস্তা, পানীয় জল, স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র - কিছুই তেমন ছিল না। গ্রামগুলো যেন ছিল একেবারে বিচ্ছিন্ন। এখন সেই চিত্র বদলে গিয়েছে। ছেলেমেয়েরা জুতো পরে সাইকেলে চেপে স্কুলে যাচ্ছে, পড়াশোনার জন্য সরকারি সহায়তাও পাচ্ছে।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন শোভা। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে গ্রামের মহিলাদের হাতে কোনও অর্থ থাকত না। এখন তাঁরা মাসে কিছু টাকা পাচ্ছেন, যা তাঁদের ছোটখাটো প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করছে। এছাড়া যুব সম্প্রদায়ের জন্য 'যুবসাথী' প্রকল্পকেও তিনি ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন। জঙ্গলমহলের এই পরিবর্তন আশাবাদী করে তুলেছে শোভাকে। তবে নিজের জীবনের স্থিতির জন্য তাঁর আবেদন-সরকার যেন তাঁকে একটি বসবাসযোগ্য ঘর দেয় এবং একটি চাকরির ব্যবস্থা করে। তাঁর কথায়, "মায়ের বয়স হয়েছে, চিকিৎসার প্রয়োজন। নিজের জীবনটাও চালাতে একটা কাজ দরকার।"
উঠোনে মহুল ফুল শুকোতে দিতে দিতে মা লক্ষ্মী সর্দার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমাদের তো মমতা আছে। উনি ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারি না।" দীর্ঘ জঙ্গলজীবন ও জেলজীবনের পর জীবনের অনেকটা সময় হারিয়েছেন শোভা। এখন তাঁর একটাই ইচ্ছা - খোলা আকাশের নিচে শান্তিতে, সাধারণ মানুষের মতো করে বাঁচা।
