বাংলায় গেরুয়া ঝড়। কলকাতার ১০০ বেশি ওয়ার্ডে পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেস। উত্তরের সিঁথি থেকে দক্ষিণে জোকা, টালিগঞ্জ, গড়িয়া-সর্বত্রই একই ছবি। ভোটাররা তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও প্রতিশ্রুতি বা কথা না শুনেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপির প্রতি আস্থা রেখে ব্যাপকহারে দলবেঁধে পদ্মফুলে বোতাম টিপেছেন। নির্বাচনী স্বাভাবিক নিয়মে এবছরের ডিসেম্বরেই কলকাতায় পুরভোট হওয়ার কথা। তবে চাইলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্য সরকার পুরবোর্ড ভেঙে দিয়ে আগেও পুরনির্বাচন করতে পারে। সেক্ষেত্রে এক্ষুনি ভোট হলে বিজেপি ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিধানসভা ভোটে এগিয়ে থাকা শুধু শতাধিক নয়, আরও অনেক বেশি আসন জিতবে বলে দাবি পদ্মশিবিরের। গেরুয়া ঝড়ের দাপটে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, বহু বর্তমান তৃণমূল কাউন্সিলর আগামী পুরনির্বাচনে হয় প্রার্থী হতে রাজি হবেন না, নয়তো দাঁড়ালে শোচনীয় হার হতে পারে বলে দাবি বিজেপি শিবিরের।
ভোটপ্রাপ্তির অঙ্কের হিসাবে কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ দুই লোকসভা কেন্দ্রেই বিজেপি বিধানসভা ভোটের নিরিখে খুবই ভালো ফল করেছে। বিশেষ করে কলকাতা দক্ষিণে বেহালা পূর্ব ও পশ্চিমের পাশাপাশি রাসবিহারী ও ভবানীপুর কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীদের জয় পদ্মশিবিরের মনোবল একধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ভবানীপুরে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাসবিহারী কেন্দ্রে জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি দেবাশিস কুমারের হার এবং যথাক্রমে শুভেন্দু অধিকারী ও স্বপন দাশগুপ্তর জয় উলটোদিকে তৃণমূল শিবিরকে জোর ধাক্কা দিয়েছে। পাশাপাশি টালিগঞ্জ কেন্দ্রে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও যাদবপুরে দেবব্রত মজুমদারকে হারিয়ে বিজেপির জয় ছিনিয়ে আনার ফল আসন্ন পুরনির্বাচনে পদ্মশিবিরের ফলাফল আরও ভালো করার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজেপির মণ্ডল সভাপতি বা জেলা নেতাদের দাবি, "মানুষ তৃণমূলের শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছে, যে কোনও মূল্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায় চেয়েছে, তাই ভোটাররা কে প্রার্থী তা না দেখেই চোখ বন্ধ করে পদ্ম প্রতীকে বোতাম টিপেছেন।"
তাৎপর্যপূর্ণ হল, দাপুটে মেয়র পারিষদ ও বরো চেয়ারম্যানদের এক একজনের ওয়ার্ডে আমজনতার রায়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে হার তৃণমূলের সংগঠনে ধস নামিয়ে দিয়েছে। নিজের ওয়ার্ডে বিপুল মার্জিনে পরাজিত একাধিক মেয়র পারিষদ ও বরো চেয়ারম্যানরা স্বীকার করেছেন, পুরসভার ব্যপক উন্নয়ন বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের পরিষেবা মানুষ ভোট দিতে যাওয়ার সময় মাথায় রাখেননি। ধর্মের মেরুকরণে সবাই ভোট দিয়েছেন। ভোট গণনার সময় বুথভিত্তিক ফলে দেখা গিয়েছে, কলকাতার যে বস্তি বা কলোনি তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক ছিল সেখানেই বড় ধস নেমেছে জোড়াফুলের সমর্থনে। বসতির পর বসতি, কলোনির পর কলোনি এবার বিধানসভা ভোটে ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের কথায় আর ভোট দেয়নি। পাড়ায় বিজেপি প্রার্থী প্রচারে না এলেও, টিভি বা সোশাল মিডিয়ায় মোদি ও শাহের বক্তব্য শুনে ওয়ার্ডের পর ওয়ার্ড পদ্মপ্রতীকে আস্থা রেখেছে। আর তাই শতাধিক ওয়ার্ডে পরাজয়ের পর তৃণমূল কাউন্সিলরদের একটাই প্রশ্ন, আর কতদিন আমাদের পুরসভা বা পরিষেবার কাজ করতে দেবে নতুন বিজেপি সরকার? কারণ, অধিকাংশ ওয়ার্ডে তৃণমূলের অফিস হয় দখল হয়ে গিয়েছে, নয়তো টালিগঞ্জ উন্নয়ন পরিষদের বহু পরিষেবা দেওয়া অফিস ভোটের ফল প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দখল করে ন নিয়েছে গেরুয়া শিবির। এখন তাই শুধুই সময়ের অপেক্ষা, পুরভোট হলে কলকাতা পুরসভাও গেরুয়া রঙে রঙিন হবে।
