বড় ভরসার বড় অংশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। না কি সংখ্যালঘু সেই ভোট ব্যাঙ্ক থেকে মূলধন ও সুদ কিছুই না পাওয়া। এই প্রশ্নটাই ভাবাচ্ছে তৃণমূলকে এবং ভোট বিশ্লেষকদেরও। কারণ, সোমবারের বিকেলে রাজ্যের ভোট (West Bengal Assembly Election) আকাশে 'রং দে তু মোহে গেরুয়া'র মধ্যেও যে টুকু নীল-সাদা পেঁজা তুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘাসফুলের উপর, তা স্পষ্ট করছে ওই আকাশ দখলের নির্ণায়ক শক্তি বাম ও কিছুটা কংগ্রেস তাদের পক্ষে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশকে নিজেদের দিকে টানতে সফল হয়েছে। যে ভোট ছিল একেবারে তৃণমূলের পকেটে। সেই সব পকেটের অনেকটাই খালি হয়েছে এই ভোটে।
রাজ্যে প্রায় ৮৫টি আসন রয়েছে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশের বেশি। তার মধ্যে অতখানি না হলেও অনেকটাই ভোট (West Bengal Assembly Election) রয়েছে নন্দীগ্রামেও। সেখানেও গতবারের চেয়ে বেশি মার্জিনে জিতেছেন শুভেন্দু অধিকারী, কারণ আইএসএফ এবং সিপিআইয়ের ভোট কাটা, হিন্দুভোটের আরও বেশি এককাট্টা হওয়া। এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনগুলির দিকে তাকালে বোঝা যাচ্ছে সেগুলিতে নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে বামেরা, কোথাও কংগ্রেস। কোনও ক্ষেত্রে এবারেও ভাঙড়ে জয়ী নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফ।
রাজ্যে প্রায় ৮৫টি আসন রয়েছে যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশের বেশি। তার মধ্যে অতখানি না হলেও অনেকটাই ভোট রয়েছে নন্দীগ্রামেও। সেখানেও গতবারের চেয়ে বেশি মার্জিনে জিতেছেন শুভেন্দু অধিকারী, কারণ আইএসএফ এবং সিপিআইয়ের ভোট কাটা, হিন্দুভোটের আরও বেশি এককাট্টা হওয়া।
তবে সবচেয়ে চমক রয়েছে মুর্শিদাবাদে। সেখানে ২২টি আসনের মধ্যে ১৭টিই মুসলিম-প্রধান। ডোমকলে সিপিএমের প্রার্থী, সংখ্যালঘু মুখ মোস্তাফিজুর রহমান জয়ের বড় কারণও সেই অঙ্কেই। সেখানেই কংগ্রেস পেয়েছে প্রায় ২৪ হাজার ভোট। ফরাক্কার কংগ্রেস প্রার্থী মহতাব শেখের নামই বাদ গিয়েছিল এসআইআরে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে তাঁর নাম ওঠে তালিকায়, তাই তাঁর জয়ও একটা চমক। রানিনগরের কংগ্রেস প্রার্থী জুলফিকার আলিও যে বিধানসভায় পা রাখবেন, সেটারও বড় কারণ সেখানকার সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের পকেট থেকে সরে গিয়ে হাত ধরা।
অন্যদিকে মুর্শিদাবাদে নতুন দল গড়া হুমায়ুন কবীরের ভরতপুর ও রেজিনগরে দাঁড়িয়ে দুই আসনেই জয় ছিনিয়ে আনা সংখ্যালঘু ভোটের তাঁকে ছপ্পড় ফাড়কে ভোট দেওয়ার জন্যই। যেটা তিনি নিজেও বলেছেন। এবং তাঁর দেওয়া প্রার্থীদের ভালো সংখ্যায় ভোট কাটা সুবিধা করে দিয়েছে পদ্ম শিবিরকে। তা ছাড়া আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া, যার অধিকাংশই সংখ্যালঘু। যা ছিল তৃণমূলের জয়ের পতাকা ওড়ানোর বড় শক্তি। তাই হিন্দু অধ্যুষিত বহরমপুরে একদা রবিনহুড ইমেজের কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরিও হালে পানি পাননি। পাশের জেলা মালদহের ছবিটাও চমকপ্রদ। সেখানে কংগ্রেস আসন না পেলেও, জেলার মিথ গনি খান চৌধুরির পরিবারের সদস্য মৌসম বেনজির নূর না জিতলেও ভালো ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। এক ডজন আসনের যে আধাআধি ভাগ হয়েছে ঘাসফুল ও পদ্মের, তারও বড় কারণ ইভিএমে মেরুকরণ। সুজাপুরে মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের জয়ের ছকও সেটাই।
বীরভূমের হাসনে সভাধিপতি কাজল শেখের জয় হলেও ১১টির মাত্র চারটি ঘাসফুল ধরে রাখতে পেরেছে এবং বাকিগুলিতে হেরেছে সেই বাম ও কংগ্রেসের ভোট কাটার কারণেই, যাঁদের অনেকটা সংখ্যালঘু। আবার এখানকার নানুরে তৃণমূলের জয়ের হিসাবও একই। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়, ক্যানিং, মগরাহাট, ডায়মন্ডহারবার অথবা উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গা, আমডাঙা, সীমান্ত বসিরহাটের কয়েকটি আসনে চোখ রাখলে ফলাফলে সেই সংখ্যালঘু ব্যাঙ্কে মূলধন ও সুদের জটিল অঙ্ক টের পাওয়া যাচ্ছে।
নদিয়ার করিমপুরে অভিনেতা সোহমের জয় হলেও সীমান্তের সংখ্যলঘু এলাকাতে শাসকদলের পরাজয়ে বোঝাই যাচ্ছে তৃণমূলের থেকে অনেকটাই সরে গিয়ে তাঁরা কেউ ঠাঁই নিয়েছেন বামে, কেউ বা কংগ্রেসে। সেই কারণেই ঘাসফুলের বাগান তছনছ হয়েছে। আবার পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে সেই ব্যাঙ্কই অটুট থেকে জিতিয়েছে শিউলি সাহাকে। উত্তর দিনাজপুরের দিকে তাকালেও বোঝা যায় ভরসার সেই ব্যাঙ্ক কিন্তু সুদ-সহ মূলধন ফেরত দেয়নি। বরং তা বিনিয়োগ হয়েছে কোথাও কংগ্রেস, কোথাও বামে। আর রামে গিয়েছে বামেদের হিন্দু ভোটের বড় অংশ। তাই বাঁদরের পিঠেভাগের অঙ্কের গল্পটাই যেন বড় বাস্তব হয়ে উঠেছে এবারে ভোটে। অন্তত তৃণমূলের কাছে।
