কারখানায় ঢুকলেই একটানা যান্ত্রিক শব্দের মাঝে চোখ চলে যাবে ব্লকপ্রিন্ট করতে থাকা কর্মীদের দিকে। একদিকে ঝটপট, ব্যস্ত হাতে সাদা বা অফ হোয়াইট খোলের উপর ফুটে উঠছে গেরুয়া রঙা পদ্মফুলের ছবি, পাশেই আবার নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে স্বাস্থ্যসাথী, সবুজসাথী, কন্যাশ্রীর মতো নানা প্রকল্পের নামধাম, সেই সঙ্গে জোড়াফুলের ছাপ। একঝলক দেখে মনে হতে বাধ্য, ভোটের হাওয়া পুরোদমে ঢুকে পড়েছে শান্তিপুরের তাঁতশিল্পেও। বাইরে যেখানে রাজনৈতিক ময়দানে তৃণমূল, বিজেপি বা বাম শিবির একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ, সেখানে তাঁতপল্লির কারখানাগুলিতে পদ্ম-ঘাসফুলের এ যেন এক অনন্য সহাবস্থানের চিত্র।
বর্তমানে শান্তিপুরের একাধিক তাঁত কারখানায় উঁকি দিলেই দেখা যাবে, একই ঘরে পাশাপাশি বসে কারিগররা বুনে চলেছেন জোড়াফুল প্রতীকের শাড়ি এবং পদ্মছাপ শাড়ি। কোথাও আবার বামেদের প্রতীক-সহ শাড়ির অর্ডারও পূরণ হচ্ছে। রাজনীতির বিভাজন সেখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে জীবিকার প্রয়োজনে। স্থানীয় তাঁত মালিক রাজু দাস জানান, "নির্বাচনের আগে শাড়ির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বড় অর্ডার আসে। আমাদের কাছে দল নয়, কাজটাই বড়।" তাঁতশিল্পীদের কথায়, অনেক বেড়ে গেছে। তবুও এই সময়টুকুই আমাদের ভরসা।" শান্তিপুরের তাঁতশিল্প বহুদিন ধরেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সহায়তা, বাজারের কারখানায় শাড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত শিল্পীরা।
সারাবছর এই শিল্প মন্দার মুখে থাকলেও ভোটের মরশুমে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। বিশেষ করে এ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক-সহ শাড়ির অর্ডার তুলনামূলক বেশি এসেছে বলে দাবি কারিগরদের। বিজেপির অর্ডারও কম নয়, যদিও বামেদের চাহিদা কিছুটা কমেছে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। তবে এই বাড়তি কাজের চাপের মাঝেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে কাঁচামালের দাম। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আঁচে রং ও সুতোর ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে লাভের অঙ্ক ততটা বাড়ছে না বলেই জানাচ্ছেন শিল্পীরা।
এক কারিগরের কথায়, "দিনরাত কাজ করছি, কিন্তু রং আর সুতো কিনতেই খরচ প্রতিযোগিতা এবং আধুনিক মেশিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকা সহজ নয়। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন যেন এই শিল্পের কাছে সাময়িক 'অক্সিজেন'। তবে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ব্যস্ততার মাঝেও রাজনৈতিক বিভাজনের কোনও ছাপ নেই কর্মশালার ভিতরে। কারিগরদের একটাই পরিচয়-তাঁতশিল্পী। তাঁদের জোড়াফুল, পদ্ম বা কাস্তে-হাতুড়ি-সবই কেবল ডিজাইন, রং আর জীবিকার উপকরণ। রাজ্য রাজনীতি যখন ক্রমশ মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, তখন শান্তিপুরের এই তাঁতপল্লি যেন বার্তা দিচ্ছে- সহাবস্থানই প্রকৃত শক্তি। এখানে রাজনীতি নয়, মানুষের জীবন আর শিল্পই শেষ কথা।
