গরিব গ্রাম, বড়লোক শহর। এমনটাই সাধারণ ধারণা। এই ভাবনা থেকেই এককালে 'অধিকার বুঝে নেওয়া প্রখর দাবিতে' গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার ডাক উঠেছিল। কিন্তু এই ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে এশিয়ার সবচেয় ধনী গ্রাম। কোথায়, কোন দেশে রয়েছে সেই স্বপ্নের মুলুক? ইউরোপে নাকি চিন-জাপানের মতো কোনও বড়লোক দেশে?
ভূভারতেই রয়েছে 'সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা' সেই গ্রাম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটের সেই গ্রামের নাম মাধাপুর। মনে রাখতে হবে, শুধু মোদি-শাহর জন্মস্থান নয় গুজরাট, দেশের দুই ধনকুবের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি এবং গৌতম আদানির রাজ্যও বটে। ভারতীয় মাত্রই জানেন, গুজরাট হল 'বেনিয়া' বা ব্যবসায়ীদের খাসতালুক। আসল কথা, কচ্ছের মাধাপুর গ্রামের কোনও কোনও গ্রামবাসীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৭০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ফিক্সড ডিপোজিট বা স্থায়ী আমানত রয়েছে। কীভাবে এতখানি সম্পদশালী হয়ে উঠল গ্রামটি?
এ যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড়ের গল্প! মাধাপুরে মূলত থাকে পটেল সম্প্রদায়ের মানুষ। গ্রামের জনসংখ্যা কম করে ৩২ হাজার। বাড়ির সংখ্য়া প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১২০০ পরিবার থাকে বিদেশে। অধিকাংশই জীবিকার সন্ধানে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের বাসিন্দা। সরকারি তথ্য বলছে, গুজরাটের এই গ্রামের সমৃদ্ধির কারণ বিদেশ থেকে আসা অর্থ। পরিবারের প্রবাসী সদস্যরাই বিদেশ থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পাঠান স্থানীয় ব্যাঙ্ক এবং পোস্ট অফিসে।
এ যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড়ের গল্প!
এই কারণেই ৩২ হাজার গ্রামবাসীর সম্পত্তির দেখভালে মাধাপুর গ্রামে শাখা খুলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ১৭টি ব্যাঙ্ক। যে সমস্ত ব্যাঙ্কের শাখা এখনও নেই, তারাও ওই গ্রামে শাখা খুলতে প্রবল আগ্রহী। একটি গ্রামে শাখা খোলার জন্য এত ব্যাঙ্ককে মুখিয়ে থাকতে দেখা যায় না সচরাচর। বলা বাহুল্য, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গ্রামের সম্পদই ব্যাঙ্কগুলিকে টেনে আনছে মাধাপুরে।
আজ নতুন নয়, গুজরাট থেকে ভাগ্যান্বেষণে চাঁদের পাহাড়ের দেশ আফ্রিকায় পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা শতাব্দীপ্রাচীন। উনিশ শতকে খোদ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ব্রিটিশ আফ্রিকার বাসিন্দা হন মূলত জীবিকার সন্ধানে। তারপর তো 'কালা আদমি'র স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া। সে অন্য ইতিহাস। মাধাপুরের প্রাক্তন প্রধান পারুলবেন বলছেন, আফ্রিকার নির্মাণ শিল্প মূলত গুজরাটিদের দখলে। এছাড়াও গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের অনেকে থাকেন ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকাতে। সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ পাঠিয়ে দেন দেশ-গাঁয়ে।
উনিশ শতকে খোদ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ব্রিটিশ আফ্রিকার বাসিন্দা হন মূলত জীবিকার সন্ধানে।
এর ফলেই তো বন্দে আলী মিয়ার রচিত 'আমাদের গ্রাম'-এর মতো আদর্শ গ্রাম হয়ে উঠেছে মাধাপুর। আনন্দময় অহঙ্কারে গ্রামবাসীরা বলতেই পারেন, "আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান/ আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ/ মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি/ চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি।"
