সুঠাম চেহারা। পেটে ছ’টি ভাঁজ। চওড়া ছাতি! পুরুষালী সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বলতে মোটের ওপর এটাই বোঝায়। এর জন্য জিমে ঘাম ঝরানো থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়ায় হাজারো বিধিনিষেধ— কত কী-ই না মেনে চলেন পুরুষেরা! কিন্তু ভাবুন তো, ভুঁড়ি বাড়িয়ে ওজন দ্বিগুণ করতে পারলেই যদি মিলত ‘সুদর্শন পুরুষ’-এর খেতাব? ভুঁড়ি বাড়িয়েই যদি হতে পারতেন মেয়েদের আকর্ষণের পাত্র?
ইথিওপিয়ার ওমো উপত্যকায় বাস করে বোদি নামের এক বিশেষ জনজাতি। সেখানে সৌন্দর্যের সমীকরণ ঠিক এমনটাই। ছিপছিপে বা পেশিবহুল চেহারা নয়, এই সমাজে যে পুরুষের ভুঁড়ি যত অতিকায়, তিনি ততটাই আকর্ষক।
প্রতি বছর জুন-জুলাই মাস নাগাদ এই উপজাতি পালন করে তাদের নববর্ষ উৎসব। স্থানীয় ভাষায় যার নাম 'কাএল'। এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হল সবচেয়ে মোটা পুরুষকে বেছে নেওয়া। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি কিন্তু কম নয়! উৎসব শুরু হওয়ার ঠিক ছ’মাস আগে থেকে মাঠে নেমে পড়েন বিভিন্ন গোত্রের অবিবাহিত যুবকেরা।
শুরু হয় এক আজব অধ্যবসায়। এক লহমায় বদলে যায় জীবনযাত্রা। যুবকেরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঢোকেন একটি আলাদা কুঁড়েঘরে। সেখানে শারীরিক পরিশ্রম সম্পূর্ণ বারণ। কায়িক কাজ তো দূরের কথা, ওই ছ’মাস কোনও মহিলার সঙ্গে সাক্ষাৎ বা শারীরিক মিলনও নিষেধ। শোয়া আর বসাতেই কাটে দিন।
তবে শুধু শুয়ে-বসে তো আর রাতারাতি ওজন বাড়ে না! তাই চাই বিশেষ ডায়েট। এই সময় যুবকদের জন্য পরিবেশন করা হয় এক অদ্ভুত পানীয়— গরুর তাজা রক্ত আর দুধের মিশ্রণ। বোদিদের কাছে গবাদি পশু অত্যন্ত পবিত্র। তাই গরুর প্রাণ না নিয়ে, শিরা ফুটো করে সাবধানে রক্ত বের করে নেওয়া হয়। তারপর মাটির প্রলেপ দিয়ে ক্ষতের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দিনে কয়েক লিটার করে এই মিশ্রণ গলায় ঢালতে হয় যুবকদের। কাজটি সহজ নয়। অনেক সময় অতিরিক্ত মেদ আর এই খাবার হজম করতে না পেরে বমিও করেন অনেকে।
অবশেষে আসে বহু প্রতীক্ষিত সেই কাএল উৎসবের দিন। কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে আসেন যুবকেরা। শরীরজুড়ে ছাই আর সাদা মাটির প্রলেপ, মাথায় রঙিন পালক। মেদের ভারে হাঁটতে গিয়ে তখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়! উপজাতির বয়স্ক বিচারকদের সামনে পবিত্র গাছের চারপাশে হেঁটে নিজেদের অতিকায় ভুঁড়ি প্রদর্শন করেন তাঁরা।
যাঁর ভুঁড়ি সবচেয়ে বড়, তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। মেলে না কোনও ধন-দৌলত বা ট্রফি। তবে বিজয়ী পান আজীবনের 'নায়ক'-এর মর্যাদা। বোদি সমাজের নারীদের কাছেও তিনি হয়ে ওঠেন স্বপ্নের পুরুষ!
উৎসব শেষ হলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসেন যুবকেরা। কয়েক মাসের মধ্যে ঝরে যায় বাড়তি মেদ। তবে কাএল উৎসবের হাত ধরে টিকে থাকে তাঁদের শতাব্দী প্রাচীন এই আজব ঐতিহ্য।
