এক পায়ে ভর দিয়ে স্বপ্ন ছোঁয়ার লড়াই। প্রতি পদে হোঁচট, কিন্তু মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছার সামনে হার মানল প্রতিবন্ধকতা। উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলার সাত বছরের একরত্তি কন্যা রাগিনী প্রমাণ করে দিল, ইচ্ছাশক্তি থাকলে ডানাহীন পাখিও আকাশে ওড়ে।
ছয় মাস বয়সে এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল তার একটা পা। মা কবিতা দেবীর কোলে চেপে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার পথেই নেমে এসেছিল সেই বিপর্যয়। ঘটিবাটি বেচে চিকিৎসা করানো হলেও ডান পা-টি আর ফিরে পাওয়া যায়নি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এক পা হারালেও মন থেকে কিন্তু ভেঙে পড়েনি এই একরত্তি!
পাড়ার অন্য শিশুরা যখন কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যেত, বারান্দায় বসে অপলক চোখে চেয়ে থাকত রাগিনী। দুই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। মার কাছে একটাই বায়না, 'আমিও স্কুলে যাব, আমিও পড়ব।' অর্থাভাবের সংসারে দিনমজুর বাবার সাধ্য ছিল না কৃত্রিম পা কিংবা বিশেষ কোনও যানবাহনের ব্যবস্থা করার। তবুও দমে যায়নি রাগিনী। ৪০০ মিটার রাস্তা এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করল সে। ক্লান্ত হলে পথের ধারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিত। তারপর আবার এগিয়ে চলা।
সম্প্রতি সে তার একটি ভিডিও বার্তায় জেলাশাসকের কাছে করুণ আবেদন জানায়। বলে, 'জেলাশাসক কাকু, আমাকে একটা তিন চাকার সাইকেল দিন। আমি ওটাতে করে স্কুলে যাব।' প্রকাশ্যে আসে রাগিণীর কঠিন জীবন সংগ্রামের চিত্র। ভাইরাল হয় সেই ভিডিওটি। সমাজমাধ্যমে সেই ভিডিও তুলে ধরে নেট নাগরিকরা পাশে দাঁড়ান রাগিনীর। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে তার এই একলব্য সদৃশ নিষ্ঠার খবর প্রকাশিত হতেই দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। এগিয়ে আসে রাজ্য প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষজন। উত্তরপ্রদেশের বালিয়ার জেলাশাসক এবং জনপ্রতিনিধিদের নজরে আসে বিষয়টি। শেষমেশ রাগিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে একটি ট্রাইসাইকেল ও আর্থিক সহায়তা। রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিং ভিডিওকলে কথা বলে রাগিনী ও তার পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
যে সমাজে প্রতিদিন শত শত শিশু সামান্য অজুহাতে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যায়, সেখানে রাগিনী এক অনন্য দৃষ্টান্ত। চারশো মিটারের এই কষ্টকর পথ আসলে তার কাছে জীবন জয়ের রাস্তা। ট্রাইসাইকেলের চাকা হয়তো তার চলার গতি বাড়াবে। কিন্তু শিক্ষার আলো পেতে যে কষ্ট সে স্বীকার করে নিয়েছে, তা যেকোনও মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। রাগিনীর এই লড়াই স্রেফ কোনও খবরের শিরোনাম নয়, তা হল এক ফিনিক্স পাখির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
