১৫ আগস্টের রক্তিম সূর্যোদয়। দিল্লির লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রীর তেরঙ্গা উত্তোলন। উন্মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়ছে স্বাধীন ভারতের পতাকা। এ দৃশ্য দেখতে বরাবর অভ্যস্ত দেশবাসী। প্রশ্ন জাগে, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে কি একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল? একেবারেই নয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত যখন স্বাধীন হয়, সেদিন কিন্তু দিল্লির লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা ওঠেনি! স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতের প্রত্যক্ষদর্শী ছিল অন্য এক প্রাঙ্গণ।
ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম জনসমক্ষে ভারতের তেরঙ্গা উড়েছিল ইন্ডিয়া গেটের কাছের প্রিন্সেস পার্কে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সেখানেই স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। নেহরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরির নথিতেও এই তথ্যের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম জনসমক্ষে ভারতের তেরঙ্গা উড়েছিল ইন্ডিয়া গেটের কাছের প্রিন্সেস পার্কে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সেখানেই স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। নেহরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরির নথিতেও এই তথ্যের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
১৫ আগস্ট ১৯৪৭ প্রথম ইন্ডিয়া গেটের সামনে প্রিন্সেস পার্কে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন হয়। ছবি: সংগৃহীত
তবে লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল ঠিক তার একদিন পর, ১৬ আগস্ট। সেদিন দিল্লির এই ঐতিহাসিক দুর্গের প্রাচীর থেকে নেহরু জাতীয় পতাকা উন্মোচন করেন এবং জাতির উদ্দেশে প্রথম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ দেন। প্রশ্ন জাগে, প্রথম পতাকা উত্তোলন অন্য প্রাঙ্গনে হলেও, লালকেল্লাই কেন হয়ে উঠল স্বাধীন ভারতের সার্বভৌমত্বের স্থায়ী মঞ্চ?
উত্তর লুকিয়ে রয়েছে লালকেল্লার রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহের সময় মেরঠ থেকে আসা বিপ্লবী সেনারা পৌঁছেছিলেন দিল্লির লালকেল্লায়। তৎকালীন মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে থাকলেও, সাধারণ মানুষের চোখে তিনি ছিলেন বৈধ শাসনের প্রতীক। বিদ্রোহীরা তাঁকেই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব সঁপে দেন।
বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজ শাসক বুঝেতে পেরেছিলেন এই দুর্গের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতা। তাঁরা বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দি করে লালকেল্লাতেই বিচার সভা বসায় এবং তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করে। শুধু তা-ই নয়, লালকেল্লার অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যের দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করে সেটিকে ব্রিটিশ সেনার আস্তানায় পরিণত করা হয়। দিল্লির শাসন ক্ষমতা দখলের মূল প্রতীক হয়ে ওঠে এই দুর্গ।
চার দশক পর সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ (আইএনএ)-এর ‘দিল্লি চলো’ ডাক পুনরায় সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বন্দি আজাদ হিন্দ বাহিনীর তিন বীর সেনা— শাহ নওয়াজ খান, প্রেম কুমার সহগল এবং গুরবক্স সিং ধিলোঁ-র বিচারসভা বসে এই লালকেল্লাতেই। ১৯৪৫ সালের এই ঐতিহাসিক বিচার বিশ্বজুড়ে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
১৬ আগস্ট ১৯৪৭ লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন করেন নেহরু। ছবি: সংগৃহীত
ঔপনিবেশিক শক্তি যে স্থানকে ভারতীয়দের পরাধীনতার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছিল, ১৯৪৭-এর আগস্টে সেটিকেই স্বাধীনতার বিজয়স্তম্ভে পরিণত করা হয়। লালকেল্লার দেয়াল শুধু ইট-পাথরের নয়, তা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। তাই আজও প্রতি ১৫ আগস্ট যখন সেখানে তেরঙ্গা ওড়ে, তখন তা আর কেবল এক অনুষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক অমর কাহিনি।
যে স্থানে বাহাদুর শাহ জাফরের বিচার হয়েছিল, সেখানেই আবার ভারতীয় স্বাতন্ত্র্যকামীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় ব্রিটিশ রাজশক্তি। নেহরু সেই সময় আইনজীবীর ভূমিকায় এই বিচার সভায় আইএনএ সেনানীদের পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। এই ঘটনা দেশবাসীর মনে স্বাধীনতার তীব্র স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয় এবং ব্রিটিশ শাসনের ভীত কাঁপিয়ে দেয়।
ঔপনিবেশিক শক্তি যে স্থানকে ভারতীয়দের পরাধীনতার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছিল, ১৯৪৭-এর আগস্টে সেটিকেই স্বাধীনতার বিজয়স্তম্ভে পরিণত করা হয়। লালকেল্লার দেয়াল শুধু ইট-পাথরের নয়, তা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। তাই আজও প্রতি ১৫ আগস্ট যখন সেখানে তেরঙ্গা ওড়ে, তখন তা আর কেবল এক অনুষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক অমর কাহিনি।
