Advertisement
কার্টুনিস্ট থেকে গণদেবতা, কীভাবে মুম্বইকে ৩ দশকের দুর্গ বানান বাল ঠাকরে? কেন হারলেন উদ্ধবরা?
অফিসের কোন ঘটনা বদলে দিয়েছিল বাল ঠাকরের জীবন? মুম্বইয়ের রাস্তায় কেন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় উপপ্রধানমন্ত্রীকে? জানুন সেই কাহিনি।
বাল কেশব ঠাকরে, সাদামাটা তরুণ আর পাঁচজন নিম্নবিত্ত মারাঠির মতোই লোকাল ট্রেনে চেপে অফিস যান। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে থাকে রং, তুলি, পেনসিল, আ্যলুমিনিয়ামের টিফিন বক্স। দিব্যি জীবন চলছিল। এক সংবাদমাধ্যমের ব্যঙ্গচিত্রের শিল্পী তিনি। বেতন পেতেন ৭৫ টাকা। ছবি: সংগৃহীত।
ওই অল্প টাকায় সংসারের খরচ চলে না বলে তাঁকে মারাঠা, কেসরী, ধণুর্ধারী প্রভৃতি পত্রপত্রিকা ও বিজ্ঞাপন সংস্থার জন্য ছবি আঁকতে হত। চাইলে দিব্যি ওই ছাপোষা জীবন বেছে নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু বালাসাহেব সেটা করেননি। তাঁর ভিতরে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছিল। মহারাষ্ট্রে মারাঠাদের দুর্দশা তাঁকে কাঁদাত। ছবি: সংগৃহীত।
চাকরিস্থলে একটা বঞ্চনা তাঁর ভিতরের আগুনের আঁচে ঘি ঢালে। সেসময় তাঁর সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঠাকরের একটি কার্টুন ছাপে আমেরিকার এক সংবাদমাধ্যম। সেজন্য মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক পাঠান ফ্রি প্রেস জার্নালের অফিসে। কিন্তু সেই টাকা ঠাকরেকে দেওয়া হয়নি। সংবাদপত্রের কর্তাব্যক্তিরা বলে দেন, ওটা ফ্রি প্রেস জার্নালে প্রকাশিত। তাই ওটার মালিক এখন ফ্রি প্রেস জার্নাল। তাই কোনও টাকা ঠাকরে পাবেন না। ছবি: সংগৃহীত।
ঠাকরের মনে হয়েছিল, সংবাদপত্রের প্রথম সারির দক্ষিণ ভারতীয় কর্তারা মারাঠী বলেই তাঁকে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেছেন। এরপর থেকেই মারাঠী মানুষের জন্য আন্দোলন শুরু ঠাকরের। নিজের সাপ্তাহিক পত্রিকা, নিজের নাট্যদলে মারাঠী অধিকার নিয়ে গর্জে ওঠা শুরু করেন। জনমত গঠন করেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠান মারাঠা অধিকার রক্ষা আন্দোলনের মুখ। ছবি: সংগৃহীত।
ধীরে ধীরে গতি পাওয়া শুরু করে ঠাকরের আন্দোলন। তাঁর পিছনে লোক জড়ো হওয়া শুরু করে। এর মধ্যে ১৯৫২ সালে মাদ্রাজ প্রদেশের তেলুগু ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে একটি আলাদা রাজ্যের দাবিতে পট্টি শ্রীরামালু ৫৬ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। কন্নড় ভাষাভাষী একটি প্রদেশ তৈরির দাবি নিয়ে জোর সওয়াল করেন আলুরু ভেঙ্কটরাও। ওই দুই রাজ্যের আন্দোলন দেখে আরও জোরালো হয় মারাঠীদের অধিকারের দাবির আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীত।
ঠাকরে মনে করতেন মহারাষ্ট্র এবং মুম্বই মারাঠাদের। অথচ সেখানেই মারঠাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে দেখা হয়। মূলত দক্ষিণ ভারতীয় তেলুগুবাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। তাঁর দাবি ছিল, মহারাষ্ট্রের চাকরি, মহারাষ্ট্রের সম্পদ, যাবতীয় আয়ের উৎসে প্রথম অধিকার শুধু মারাঠাদেরই। ছয়ের দশকে 'মার্মিক' পত্রিকায় নিয়মিত প্রচার করা শুরু করেন মারাঠী মানুষের স্বার্থের কথা। ছবি: সংগৃহীত।
বালাসাহেব ঠাকরের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বিক্ষোভ, প্রতিরোধ করে লাভ হবে না। কেউ গুরুত্ব দেবে না। নিজের দাবি আদায় করতে হলে সেই নিজেদের মতবাদ চাপিয়ে দিতে হবে। সেটা যেভাবেই হোক। তাই তাঁর ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচি, আন্দোলন, বনধ রীতিমতো হিংসাত্মক হত। একটা পর্যায়ে গোটা মুম্বইয়ের মারাঠা সমাজ তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে যায়। ১০ মিনিটে মুম্বই অচল করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। ছবি: সংগৃহীত।
সালটা ১৯৬৯। কর্নাটকের দুই মারাঠী ভাষী জেলাকে মহারাষ্ট্রের অন্তর্গত করার দাবিতে উত্তাল মুম্বই। সেসময় মুম্বই যাওয়ার কথা তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই। বালাসাহেব আগেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, মারাঠীদের বিরুদ্ধে কুকথা বলা কাউকে মুম্বই ঢুকতে দেওয়া হবে না। মোরারজির বিরুদ্ধে আগেই মারাঠীদের অপমান করার অভিযোগ ছিল। তা সত্ত্বেও মোরারজি মুম্বই যান। গোটা শহর কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়। কিন্তু তাও শিব সৈনিকদের রোখা যায়নি। উপপ্রধানমন্ত্রীকে মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ঘিরে ফেলেন ঠাকরের অনুগামীরা। পুলিশ ঠাকরে-সহ গোটা শিব সেনা নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তাতে বিক্ষোভ আরও হিংসাত্মক রূপ নেয়। প্রাণহানি হয়। বাধ্য হয়ে কংগ্রেস সরকার ঠাকরের কাছে লিখিতভাবে শান্তি ফেরানোর আবেদন জানায়। শেষে ঠাকরে বিবৃতি জারি করে হিংসা থামান। ছবি: সংগৃহীত।
ঠাকরে শিব সেনা প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৬৬ সালে। দু'বছর বাদে প্রথম নির্বাচনেই মুম্বইয়ে দাগ কাটে ঠাকরের সেনা। মুম্বইয়ের ১২১ আসনের মধ্যে ৪২টি জেতে শিব সেনা। এরপর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে শিব সেনা। ছবি: সংগৃহীত।
১৯৭১ সালে প্রথম শিব সেনার মেয়র পায় মুম্বই। এরপর ১৯৮৫ সাল থেকে কখনও কংগ্রেস, কখনও শিব সেনার মেয়র থেকেছেন। ১৯৮৫ সালে ছগন বুজবল শিব সেনার মেয়র হন। টানা ছবছর ছিল শিব সেনা। এরপর ১৯৯৬ সালে ফের মুম্বই দখল করে শিব সেনা। এরপর ২০২৬ পর্যন্ত টানা মুম্বই শহরের মেয়র পদ ছিল শিব সেনার দখলে। ছবি: সংগৃহীত।
তিন দশক বাদে বিজেপি শিব সেনার সেই একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিনিয়ে নিল। সম্ভবত প্রথমবার বিজেপির মেয়র পাবে বাণিজ্য নগরী। বাল ঠাকরের গড়া শিব সেনার লিগ্যাসি খুইয়ে ফেলেছেন উদ্ধব ঠাকরে, রাজ ঠাকরেরা। আসলে উদ্ধব বা রাজ কারও মধ্যেই বালাসাহেব ঠাকরের মতো মাঠে নেমে আন্দোলন করার মতো মানসিকতা ছিল না। ঠাকরে যেমন সাধারণ কার্টুনিস্ট থেকে 'গণদেবতা' হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো তাঁর সন্তান বা ভাইপো কেউই সেটা পারলেন না। ছবি: সংগৃহীত।
Published By: Subhajit MandalPosted: 07:51 PM Jan 17, 2026Updated: 08:59 PM Jan 17, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
