Advertisement
উড়িয়ে আনা হয় পাথর, আস্ত এই শিবমন্দির নাকি 'তেনা'দের তৈরি! আজও সূর্য ডোবার পর প্রবেশ নিষেধ
ঈশ্বর যেখানে থাকেন, সেখান থেকে শতহস্ত দূরে থাকে ভূত-প্রেতের দল, এমনটাই বিশ্বাস সাধারণ মানুষের। কিন্তু এ হিসেব বদলে যায় মধ্যপ্রদেশের কাঁকনমঠের ক্ষেত্রে।
এই মন্দিরের বয়স হাজার বছরেরও বেশি। কেবল স্থাপত্যশৈলীর জন্য নয়, মন্দিরের পরিচিতির আসল কারণ, এর নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক রহস্যজনক কাহিনি। কেউ মনে করেন, তা কেবলই লোককথা। যদিও বাস্তবচিত যুক্তি দিয়ে যে পৃথিবীর সব রহস্যের সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে একমত হতেই হয়। বিশেষ করে সে গল্পে যখন উল্লেখ থাকে অশরীরীদের, তখন রহস্য আরও ঘনায় বৈকি!
মধ্যপ্রদেশের মোরেনা জেলার সিহোনিয়ার কাছে অবস্থিত কাঁকনমঠ। মন্দিরটি নির্মিত হয় আনুমানিক একাদশ শতাব্দীতে। তত্ত্বাবধান জনিত অবহেলার কারণে বর্তমানে তার ভগ্নপ্রায় দশা। তবু তার কঙ্কালপ্রায় শরীরটি নিয়ে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাঁকনমঠ। মন্দিরটির কারুকাজ দেখতে ভিড় করেন পর্যটকরা। খাতায় কলমে এ মন্দির অবশ্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে সংরক্ষিত।
এ মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন দেবাদিদেব। মন্দিরের গর্ভগৃহে আজও রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, পূর্বে এই মন্দির ঘিরে এক বৃহত্তর চত্বর ছিল। মূল মন্দির ছাড়াও চার পাশে ছিল চারটি ছোট মন্দির। ঈশ্বর যেখানে থাকেন, সেখান থেকে শতহস্ত দূরে থাকে ভূত-প্রেতের দল, এমনটাই বিশ্বাস সাধারণ মানুষের। কিন্তু এ হিসেব বদলে যায় কাঁকনমঠের ক্ষেত্রে!
আনুমানিক ১০১৫-১০৩৫ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কচ্ছপঘাটা বংশের শাসক রাজা কীর্তিরাজ। সিহোনিয়ায় এই শিবমন্দির তৈরির উদ্যোগ যে তাঁরই, তা জানা যায় গোয়ালিয়রে প্রাপ্ত এক শিলালিপি থেকে। সে সময় অবশ্য সিহোনিয়ার নাম ছিল সিংহপানিয়া। রাজা কীর্তিরাজ রাজত্ব করতেন সেখানে। মন্দিরের নাম কাঁকনমঠ হওয়ার পিছনেও রয়েছে রাজা কীর্তিরাজের এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত কারণ।
প্রচলিত লোককথা অনুসারে, রাজা কীর্তিরাজের সবচাইতে প্রিয় রানির নাম ছিল কাঁকনবতী বা কাঁকনদেবী। তিনি ছিলেন মহাদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর ইচ্ছে পূরণ করতেই এ শিবমন্দিরের নির্মাণে সচেষ্ট হন রাজা কীর্তিরাজ। মন্দিরের নামে জুড়ে দেন রানির নাম। যাতে শত বছর পেরিয়েও লোকমুখে রানির নামটি বেঁচে থাকে। সে উদ্দেশ্য যে সফল, তা বলাই বাহুল্য।
তবে আরও একটি মত প্রচলিত রয়েছে মন্দিরের নামকরণ প্রসঙ্গে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, নির্মাণকালে চূড়া পর্যন্ত সোনা দিয়ে মোড়া ছিল এই মন্দির। সোনার অপর নাম কনক হওয়ায়, মন্দিরের নামই হয়ে যায় কনকমঠ। পরে সেই নামই লোকের মুখে মুখে কাঁকনমঠ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এমন দাবির বাস্তব ভিত্তি নিয়ে সংশয় রয়ে যায়।
বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয় মন্দিরের অসামান্য নির্মাণশৈলী দেখে। কোনও রকম চুন, সিমেন্ট কিংবা আঠাজাতীয় পদার্থ নয়। মন্দিরটির দাঁড়িয়ে থাকার মূলে কেবল ভারসাম্যের খেলা! বিশাল বিশাল পাথরের টুকরোকে এমন নিখুঁতভাবে একটির ওপর একটি চাপিয়ে রাখা হয়েছে যে হাজার বছরের ঝড়বাদলা-ভূমিকম্প পেরিয়েও মন্দিরের ভিত টলে যায়নি। আগামী বহু বছরও তা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে একইভাবে।
আর অবাক করা নির্মাণশৈলীই জন্ম দিয়েছে নানা লোককাহিনির। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, এমন নিখুঁত নির্মাণের পিছনে মানুষ নয়, রয়েছে কোনও অশরীরী শক্তি! কথিত রয়েছে, মাত্র এক রাতেই নাকি তৈরি হয়ে গিয়েছিল ১১৫ ফিট উঁচু এই মন্দির। মন্দির তৈরিতে ব্যবহার হয়েছিল এমন ধরণের পাথরের চাঁই, যা সাধারণত সে এলাকায় পাওয়া যায় না। এমনকি পাওয়া যায় না আশেপাশের কোনও এলাকাতেও।
অমানসিক শক্তিধর অশরীরীরা হাওয়ায় উড়িয়ে এনেছিল সেসব পাথর। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভোর হয়ে যায়! সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করে আকাশের কোনে। এমন অবস্থায় দ্রুত উধাও হয়ে যায় অশরীরীর দল। মন্দিরের কাজ তখনও অসম্পূর্ণ। সেই থেকে আজও একইভাবে অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে মন্দিরটি। যে অজানা শক্তির হাত ধরে কাজটির সূচনা, সে আর ফিরে আসেনি কখনোই।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, মন্দিরের ভিতরেও রয়ে গিয়েছে অলৌকিক শক্তির রেশ। যা চোখে না দেখা গেলেও, আছে! সেই শক্তিই এত বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রায় ধসে যাওয়া এই মন্দিরটিকে। যদিও সত্যিই যে এক রাতের মধ্যে তৈরি হয়েছিল কাঁকনমঠ, এ যুক্তির কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি মেলে না খুঁজলেও। সমস্তটাই জনশ্রুতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনধারা গল্পের জন্মের কারণ মন্দিরের সুকৌশলী নির্মাণকাজ।
তবে কাঁকনমঠের জনপ্রিয়তার পিছনে মূল কারণই এই ভূতেরা! অর্থাৎ, মন্দিরের সঙ্গে অশরীরীদের যুক্ত থাকার গল্প রটে যাওয়াতেই তা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর দেশ বিদেশ থেকে বহু মানুষ এই মন্দির দেখতে আসেন। অনেকেই আবার মনে করেন, বিশেষভাবে পবিত্র এই মন্দির। তীর্থস্থান হিসেবে তাঁরা গণ্য করেন কাঁকনমঠকে। প্রতি শিবরাত্রিতেই বিপুল পরিমাণে ভক্ত সমাগম হতে দেখা যায় সেখানে।
Published By: Utsa TarafdarPosted: 07:31 PM Mar 09, 2026Updated: 07:31 PM Mar 09, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
