বাঙালির ইতিহাসে দেশভাগ এক দগদগে ক্ষতর সমান। সেই অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে দুর্গাপুজোর স্মৃতিও। ওপার বাংলা থেকে 'মা'ও এসেছিলেন এপারে। ফরিদপুরের ঘটকবাড়ির দুর্গা আজ পূজিত হন রামগড়ে। ঘটকবাড়ির পুজো আজও মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে কতটা গভীর আবেগ, স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ঐতিহ্যের প্রতিমূর্তি। দীর্ঘ উত্তরাধিকার, ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়েও টিকে থাকার গল্প বলে ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো। দুই বাংলার সংস্কৃতি, দেশভাগের ইতিহাস এবং প্রায় ৩১০ বছরের পারিবারিক প্রথা জড়িয়ে আছে এই পুজোয়।
বর্তমান প্রজন্মের পুজোর অন্যতম আয়োজক প্রসেনজিৎ ঘটক জানান, পুজোর কয়েকটাদিন দূর থেকে পরিবারের সদস্যরা এসে হাজির হন রামগড়ের বাড়িতে। সকলেই মেতে ওঠেন আনন্দময়ীর উৎসবে।
প্রায় তিন শতাব্দীরও বেশি সময় আগে ঘটক পরিবারের পূর্বপুরুষদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা। সেই সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া এই পুজো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা একই বিশ্বাস, ভক্তি এবং পারিবারিক সংস্কারকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গোৎসবের আয়োজন করে আসছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। মাঝে এসেছে দেশভাগ। সেই বিভাজন শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না, তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়।
এই পরিবারের পূর্বপুরুষ বিধুভূষণ ঘটক ছিলেন মা সারদাদেবীর প্রত্যক্ষ শিষ্য। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর ছিল অবদান। অংশ নিয়েছিলেন ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও। ওপার বাংলা থেকে এপারে এসেও পুজোর রীতিতে কোনও ছেদ পড়েনি। ফরিদপুর থেকে যে পুজোর সূচনা হয়েছিল, দেশভাগের পর সেই পুজোর ধারাবাহিকতা নতুন ভূখণ্ডেও বজায় রাখা হয়। শাক্ত মতে সব আচার অনুষ্ঠান মেনে আজও পুজো হয় ঘটক পরিবারে। এখনও দুই শতাব্দীর প্রাচীন নিয়ম মেনে পুজোর তিন দিনই বলি হয় মহামায়ার সামনে। নিজের হাতে সেই বলিদান দেন পরিবারেরই কোনও সদস্য। শুধু তাই নয়, এই ঘটক পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মা দুর্গার বামে থাকেন গণেশ। আর কার্ত্তিকের অবস্থান কলা বউয়ের পাশে মায়ের ডান দিকে।
বর্তমান প্রজন্মের পুজোর অন্যতম আয়োজক প্রসেনজিৎ ঘটক জানান, পুজোর কয়েকটাদিন দূর থেকে পরিবারের সদস্যরা এসে হাজির হন রামগড়ের বাড়িতে। সকলেই মেতে ওঠেন আনন্দময়ীর উৎসবে। সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় আজও পুজো আয়োজনে অর্থের অভাব হয়নি কখনও। মধ্যবয়সি প্রজন্মের কাছে এটি দায়িত্ব ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি নিজেদের পরিচয় ও শিকড়কে জানার এক অনন্য সুযোগ। এইভাবেই প্রায় ৩১০ বছরের দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে একটি পারিবারিক দুর্গাপুজো আজও তার স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে।
প্রাচীন নিয়ম মেনে পুজোর তিন দিনই বলি হয় মহামায়ার সামনে।
বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম বড় শক্তি হল তার ধারাবাহিকতা। সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, স্থান বদলায়—কিন্তু কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে থেকে যায়। দুর্গাপুজো তার অন্যতম উদাহরণ। ঘটকবাড়ির পুজোর বিশেষত্ব এখানেই যে, এর ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে দুই বাংলার সম্পর্ক। দুই বাংলার রাজনৈতিক সীমানা আলাদা হলেও ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, লোকাচার এবং উৎসবের আবেগের মধ্যে রয়েছে গভীর মিল। দুর্গাপুজো সেই সাংস্কৃতিক মিলনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। ঘটক পরিবারের পুজোর দীর্ঘ ইতিহাস সেই ঐক্যের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। ধর্মীয় আচার সংরক্ষণ করে না, সংরক্ষণ করে একটি পরিবারের সামাজিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা পরিচয়। ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধুমাত্র কয়েক দিনের উৎসব নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে প্রায় তিন শতাব্দীর ইতিহাস। সর্বোপরি, এটি দুই বাংলার সংস্কৃতিকে এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রাখার এক উজ্জ্বল প্রতীক। সীমানা বদলেছে, সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজোর মূল সুর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা, শিকড়কে স্মরণ করা এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।
