অষ্টমীর সন্ধিক্ষণ। চারপাশে তখন মানুষের ভিড়। আচমকাই হাতে ধরা ছোট্ট কামান থেকে বেরিয়ে আসে বিকট শব্দ! মুহূর্তের জন্য বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। সেই শব্দ যেন ৩২৬ বছর আগের এক অন্ধকার অধ্যায়ের দরজা খুলে দেয়। আজ যে ছোট কামানটি ঐতিহ্যের অংশ, একসময় সেই ধরনের অস্ত্রই ছিল যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার।
পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসার জঙ্গলঘেরা গ্রাম লোহাগুড়ি। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি গ্রাম। কিন্তু এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লোহা, আগুন, অস্ত্র এবং সামন্ত রাজাদের সময়ের ইতিহাস। শতাব্দী প্রাচীন জঙ্গলঘেরা এলাকায় লৌহ আকরিক গলিয়ে অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করা হত বলে স্থানীয় ইতিহাসে প্রচলিত। আগুনে গলানো সেই লোহা দিয়ে তৈরি হতো যুদ্ধের সরঞ্জাম। সেই অস্ত্র পৌঁছে যেত তৎকালীন স্থানীয় শাসক ও সামন্ত রাজাদের হাতে। সেই সময় ক্ষমতার লড়াই মানেই ছিল যুদ্ধ। জমি দখল, আধিপত্য বিস্তার কিংবা শাসন প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে চলত সংঘর্ষ। আর সেই সংঘর্ষের জন্য প্রয়োজন ছিল অস্ত্র। লোহাগুড়ির সঙ্গে তাই জড়িয়ে যায় সেই অস্ত্র তৈরির ইতিহাস।
লোহাগুড়ি গ্রামে অস্ত্র তৈরি হত এই বাড়িতে। নিজস্ব চিত্র
লোহা গলানো এবং অস্ত্র তৈরির সেই ইতিহাস থেকেই এই গ্রামের নাম লোহাগুড়ি। কালের স্রোতে বদলে গিয়েছে সবকিছু। সামন্ত রাজাদের সেই সময় নেই, নেই যুদ্ধের সেই রক্তাক্ত দিন। কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি আজও রয়ে গিয়েছে। প্রাচীন খাড়া এবং ছোট কামানের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন সেই অতীতের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026)। মহাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে আজও সেই ঐতিহ্য মেনে হাতে তুলে নেওয়া হয় ছোট কামানটি। তারপর দাগা হয় কামান। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। ভিড়ের মধ্যে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সেই প্রাচীন ঐতিহ্য।
লোহাগুড়ির সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো। ফাইল ছবি
মনে হয়, কয়েকশো বছরের পুরনো সেই সময় যেন আচমকাই ফিরে এসেছে। কামানটি বিশাল নয়। হাতে বহন করা যায়। আজ সেটি যুদ্ধের অস্ত্র নয়, বরং সরকারবাড়ির পুজোর এক ঐতিহ্যবাহী অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই রীতি চলে আসছে। অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে সেই কামানের শব্দ শুনতে বহু মানুষ ভিড় জমান। কারও কাছে এটি পুজোর রীতি, কারও কাছে পুরনো দিনের স্মৃতি। আর ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে এই ছোট্ট কামানই যেন লোহাগুড়ির হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র। পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। চার দিন ধরে চলে মহা ধুমধাম এর সাথে পুজো। ৩২৬ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে এই পুজো। রীতি মেনে হয় পুজো। হয় ছাগবলি। চারদিন ধরে চলে নরনারায়ণ সেবা।
সরকার বাড়ির প্রবীণ সদস্য জগবন্ধু সরকার বলেন, “এই কামান আমাদের কাছে শুধু একটা পুরনো জিনিস নয়, এর সঙ্গে আমাদের পরিবারের বহু বছরের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, মহাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে এই কামান দাগা হয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই রীতি চলে আসছে বলে আমরা শুনে এসেছি। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু এই ঐতিহ্য আমরা এখনও ধরে রেখেছি। কামানের শব্দ উঠলেই আমাদের মনে হয়, পূর্বপুরুষদের সেই সময়টা যেন আবার চোখের সামনে ফিরে এল। আগামী প্রজন্মও যাতে এই ইতিহাস ভুলে না যায়, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
