রূপমের 'একলা ঘর' গানটা শোনা হয়নি, এমন মানুষ বোধ'য় কমই আছেন। তবে কথা গান নিয়ে নয়, মহিলাদের 'একলা থাকার অভ্যেস' নিয়ে। ব্যাপারটা ঠিক কী? আজকাল একটা বিষয় খুব চোখ টানছে। মেয়েরা আর বিবাহিত জীবনে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বেঁচে থাকতে গেলে একটা ঘর, স্বামী, সংসার, সন্তান—এই প্রথাগত ধারণাতে তাঁরা আর নেই। বরং আজকাল তাঁরা 'একা' থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। কলকাতার অলিগলি থেকে ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দা, একা থাকার এক নয়া সংজ্ঞা তৈরি হতে শুরু করেছে দিকে দিকে। আধুনিক শহুরে নারীরা এখন আর একাকীত্বকে পাত্তা দিচ্ছেন না। বরং সাদরে বরণ করে নিচ্ছেন একাকী জীবনকে। এ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, অধিকন্তু নিজেকে নিজের সময় দেওয়ার কৌশল। আর একেই এখন অনেকে বলছেন ‘পাওয়ার অফ সলিটিউড’।
ছবি: সংগৃহীত
বিশ শতকের শেষ দিকে নারীরা যখন প্রবলভাবে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে শুরু করলেন, তখন সাফল্য মানেই ছিল সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা। কেরিয়ার, পরিবার আর সামাজিক অনুষ্ঠান—সব সামলে যে নারী যত বেশি সক্রিয়, তিনিই ছিলেন ততোধিক সফল। কিন্তু সেই নিরন্তর দৌড় আর প্রত্যাশার চাপ এখন এক ধরনের ক্লান্তি নিয়ে এসেছে। দিনভর অন্যের জন্য ‘পারফর্ম’ করতে করতে নিজের সত্তাটাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই বর্তমানের এই নতুন ট্রেন্ড আদতে নিজের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, এই 'একলা' হওয়া আসলে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সবার ডাকে সাড়া দেওয়ার যে সামাজিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, তা মানুষকে মানসিকভাবে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এই ক্লান্তি থেকেই মুক্তির পথ খুঁজছেন নারীরা। একা থাকার অর্থ হল এমন একটা পরিসর তৈরি করা, যেখানে কোনও বাহ্যিক কোলাহল থাকবে না। নিজের ইচ্ছামতো চলা, ভাবা বা স্রেফ চুপ করে থাকার মধ্যেও যে শান্তি আছে, তা এখন বহুমূল্য।
ছবি: সংগৃহীত
এই নির্জনতা সৃজনশীলতার পথেও বড় সহায়ক। যখন বাইরের জগতের হইচই থিতিয়ে যায়, তখনই মানুষের অন্তরাত্মার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজের লক্ষ্য স্থির করা কিংবা নতুন কোনও শখের চর্চা করার জন্য এই সময়টুকু একান্ত প্রয়োজনীয়। অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভর না করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার আত্মবিশ্বাস জন্মায় এই নির্জন যাপন থেকেই।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, নিজের সঙ্গে ভালো সময় কাটানোর অভ্যাস কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে আরও মজবুত করে তোলে। যখন কেউ একা থাকতে ভয় পান না, তখন তিনি স্রেফ প্রয়োজনের তাগিদে বা একাকীত্ব দূর করতে কারও ওপর নির্ভর করেন না। ফলে সেই সম্পর্কগুলো অনেক বেশি সৎ এবং গভীর হয়। তাই একা হওয়া মানেই একাকীত্বে ভোগা নয়। বরং 'আত্মপরিচয়' খুঁজে নেওয়ার এই লড়াইয়ে নারীরা আজ অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমাজ কী ভাবল, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠছে নিজের মানসিক প্রশান্তি। একা থাকা মানেই আর নিঃসঙ্গ হওয়া নয়।
