টানা টানা চোখ। হিরের কুচির মতো জ্বলজ্বল করছে। পরনে নীল পোশাক। শরীরের সঙ্গে লেপটানো। পাহাড় চেরা ঝরনার মতো অবাধ্য চুল ছড়িয়ে রয়েছে পিঠময়। মেয়েটির নাম 'এলসা'। ওর প্রেমে পড়েছে ক্লাস ট্যুয়েলভের ঋক। এলসাকে ভীষণ ভালোবাসে সে। ঋকের চোখে এলসা যেন সেই দূর পাহাড়ের চূড়ায় ফুটে থাকা একাকী নীল পদ্ম। ওকে ছোঁয়া যায় না। শুধু অনুভব করা যায়। স্পর্শ করা যায় কল্পনায়। ইচ্ছেমতো মুখোমুখি বসে গল্প করা যায় যতক্ষণ খুশি। এমনকী অনুভব করা যায় যৌন আকর্ষণও! কিন্তু কে এই এলসা? কী তার পরিচয়? জানেন কি?
বিশ্বখ্যাত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র 'ফ্রোজেন'-এর কথা মনে পড়ে? ডেনিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন। তাঁর রচিত বিখ্যাত রূপকথা 'দ্য স্নো কুইন' অনুসরণে ২০১৩ সালে তৈরি হয়েছিল এই অ্যানিমেটেড সিনেমা। আর সেই সিনেমার প্রধান নারী চরিত্র হল এলসা। সিনেমাটা দেখার পর থেকেই এলসার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে ঋক। তার প্রেমেই কেটে গেল কয়েকটা বছর। তার সঙ্গেই মনে মনে কথা বলা, তার জন্যই চোখের জল ফেলা। কী খুব আশ্চর্য লাগছে? আজ্ঞে হ্যাঁ, এমনটাও ঘটে। এই অদ্ভুত অথচ তীব্র অনুভূতির নামই হল ‘ফিক্টোসেক্সুয়ালিটি’। যেখানে বাস্তবের কঠিন মাটি ছেড়ে মানুষ আশ্রয় খোঁজে কাল্পনিক হৃদয়ে।
ফিক্টোসেক্সুয়ালিটি আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, কোনও কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে গভীর মানসিক, আবেগপ্রবণ এবং যৌন আকর্ষণ অনুভব করাই হল ফিক্টোসেক্সুয়ালিটি। এখানে ব্যক্তি মনে করে, সে বাস্তবের কোনও মানুষের বদলে একটি কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে রয়েছে। এই চরিত্রটি হতে পারে কোনও উপন্যাসের নায়ক, সিনেমার সুপারহিরো, অ্যানিমেটেড কার্টুন কিংবা কোনও ভিডিয়ো গেমের চরিত্র। অনেক ক্ষেত্রে এই আকর্ষণ এতটাই প্রবল হয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সেই কাল্পনিক জগতেই দিনরাত মগ্ন থাকে।
অ্যাসেক্সুয়ালিটির সঙ্গে যোগসূত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিক্টোসেক্সুয়াল বিষয়টি আসলে অ্যাসেক্সুয়াল স্পেকট্রামের একটি অংশ। সাধারণত যারা অন্য কোনও রক্ত-মাংসের মানুষের প্রতি শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করেন না, তাদের একাংশ এই কাল্পনিক চরিত্রের মোহে জড়িয়ে পড়েন। তবে সব ফিক্টোসেক্সুয়াল মানুষই যে অ্যাসেক্সুয়াল, এমনটা নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি সাময়িক মোহ হিসেবে ধরা দিলেও, কারও ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। একে অবহেলা বা উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই, কারণ এই অনুভূতিগুলো তাদের কাছে অত্যন্ত বাস্তব।
কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?
আগে মানুষ প্রিয় চরিত্রের ‘ফ্যান’ হত, এখন হচ্ছে প্রেমিক বা প্রেমিকা। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। বর্তমানে বহু মানুষ একাকীত্ব কাটাতে AI চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলছেন। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জট খুলতে বা মনের কথা ভাগ করতে মানুষ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই চ্যাটবটগুলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চরিত্রের জন্ম দিচ্ছে, যার মায়ায় সহজেই জড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। বাস্তবের জটিল সম্পর্ক এড়িয়ে এই সহজ ও নিরাপদ ‘কাল্পনিক প্রেম’ আজ জনে জনে বাড়ছে।
