সনাতন ধর্মের অন্যতম পুণ্যোৎসব রথযাত্রা। আগামী ১৬ জুলাই (৩১ আষাঢ়), বৃহস্পতিবার পালিত হবে এই উৎসব। ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাদেবীর এই রথযাত্রা কেবল লোকায়ত উৎসব বা বাহ্যিক ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক পরম আধ্যাত্মিক সত্য। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং এই উৎসবের গূঢ় অন্তর্নিহিত ভক্তিমূলক ভাবকে প্রকাশ করে গিয়েছেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের চোখে রথযাত্রা আসলে এক দিব্য পুনর্মিলনের মহোৎসব। লিখছেন ড. সুমন্ত রুদ্র (ডিন, ভক্তিবেদান্ত রিসার্চ সেন্টার)।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর অমর সৃষ্টি ‘চৈতন্যচরিতামৃত’। সেখানে পুরীর রথযাত্রার এক অনুপম রূপ বর্ণিত হয়েছে। নীলাচলে জগন্নাথদেবের রথের সামনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই আকুল নৃত্য এবং ভাবাবেগ আজও ভক্তমনে ভক্তিরস জোগায়। মহাপ্রভুর সেই পদাবলি মূলত ছিল শ্রীমতী রাধারানীর বিরহবেদনার বহিঃপ্রকাশ। দ্বারকার রাজকীয় ঐশ্বর্য ছেড়ে শ্রীকৃষ্ণকে পুনরায় বৃন্দাবনের মাধুর্য ও অন্তরঙ্গ প্রেমে ফিরিয়ে আনার আকুলতাই ছিল মহাপ্রভুর ভাবান্দোলনের মূল ভিত্তি।
‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এর মধ্যলীলায় মহাপ্রভুর মুখে উচ্চারিত হয়েছিল এক বিখ্যাত শ্লোক— ‘সেই ত পরাণ-নাথ পাইনু। যাহা লাগি’ মদন-দহনে ঝুরি’ গেনু।’ এর গূঢ় অর্থ হল, দীর্ঘ বিরহের পর আজ যেন জীবাত্মা তার পরমাত্মার সন্ধান পেল। বৈষ্ণব দর্শনে রথযাত্রা তাই কোনও বহির্যাত্রা নয়। তা আসলে অন্তরের কৃষ্ণাভিমুখী এক পরম যাত্রা। কৃষ্ণ একই থাকলেও, ভক্তহৃদয় সর্বদা তাঁর ঐশ্বর্যের পরিবর্তে বৃন্দাবনের মাধুর্যকেই কামনা করে।
এই পরম দর্শনই প্রতিফলিত হয়েছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বাণীতে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় অর্জুনকে বলেছিলেন, ‘মন্-মনাঃ ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু’। অর্থাৎ, সর্বদা ভগবানের চিন্তা করা, তাঁর ভক্ত হওয়া এবং তাঁর চরণে আত্মসমর্পণ করাই পরম ধর্ম। রথযাত্রার মূল আত্মাও ঠিক তাই। ভক্তি ও স্মরণের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে ভগবানের মন্দির করে তোলা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাবধারা বিশ্বজনীন রূপ নিয়েছে। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রথযাত্রা আজ আর শুধু পুরী বা ভারতবর্ষের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই। কলকাতা, মুম্বই ছাড়িয়ে এই উৎসব আজ সমাদৃত হচ্ছে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কের রাজপথে। মহাপ্রভুর প্রেম, সাম্য ও সংকীর্তনের বাণী ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। আজকের এই অশান্ত ও বস্তুবাদী পৃথিবীতে রথযাত্রার চাকা আমাদের শান্তি ও শাশ্বত পথের দিশা দেখায়। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা যে ঈশ্বরের প্রেমময় সেবায়, রথযাত্রা আমাদের সেই সত্যই স্মরণ করিয়ে দেয়।
