দুপুর বারোটার তীব্র দাবদাহ। তারই মধ্যে নয় অগ্নিকুণ্ড। চারদিকে জ্বলছে হু হু আগুন। আর সেই আগুনের বৃত্ত মাঝে বসে রয়েছেন এক রুশ কন্যা। নাহ, কোনও গল্পকথা নয়। কিংবা টানটান সিনেমার দৃশ্যপটও নয়। সম্প্রতি রাজস্থানের পুষ্করের শ্মশানভূমিতে দেখা গেল এমনই এক আশ্চর্য দৃশ্য। আগুনের ঠিক মাঝখানে বসে দেবাদিদেবের আরাধনায় মগ্ন এক নারী। সমস্ত জাগতিক সুখ-বিলাসিতা ত্যাগ করে এক বিদেশি রমণী মেতে উঠেছেন সনাতন ধর্মের প্রাচীন ও অত্যন্ত কঠিন ‘নয় ধুনী’ তপস্যায় ।
এই সাধিকার নাম যোগিনী অন্নপূর্ণা নাথ। নাথপন্থী এই যোগিনী গায়ে ভস্ম মেখে, শ্মশানের নিস্তব্ধতায় প্রতিদিন প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা ধরে শিবসাধনা করেন। সঙ্গে গুরু বীজ মন্ত্র জপ। একা অন্নপূর্ণা নন, তাঁর সঙ্গে এই অগ্নিপরীক্ষায় শামিল হয়েছেন তাঁর গুরু বালযোগী দীপক নাথও। গত ৩ মে থেকে শুরু হওয়া এই কঠোর ব্রত চলবে আগামী ২৫ মে পর্যন্ত। শেষ দিনে পূর্ণাহুতি, হোমযজ্ঞ ও সন্ত ভাণ্ডারার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে এই যজ্ঞের।
কী এই 'নয় ধুনী' তপস্যা?
নাথ সম্প্রদায়ের হঠযোগের অন্যতম রূপ এই নয় ধুনী তপস্যা। আধ্যাত্মিক গুরুদের মতে, ‘ধুনী’ শব্দের অর্থ হল পবিত্র আগুন। এই সাধনায় সাধকের চারপাশের আটটি দিক এবং একদম কেন্দ্রে একটি, অর্থাৎ মোট নয়টি অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়। যখন দুপুরের দিকে সূর্যের উত্তাপ চরমে পৌঁছয়, ঠিক তখনই সাধক এই আগুনের বলয়ের মাঝে যোগমুদ্রায় বসেন। শরীরকে তাপ থেকে রক্ষা করতে পুরো অঙ্গে মাখানো হয় গোবর থেকে তৈরি বিশেষ ভস্ম। সাধারণত ২১ দিন ধরে চলে এই কৃচ্ছ্রসাধন। প্রতিদিন ঘুঁটের সংখ্যা বাড়িয়ে আগুনের তীব্রতা আরও বাড়ানো হয়। হিন্দুশাস্ত্রে এই ধরনের তপস্যার বহু উল্লেখ রয়েছে।
তপস্যার আসল উদ্দেশ্য
এটি কেবল কৃচ্ছ্রসাধন বা শারীরিক কষ্ট সহ্য করার পরীক্ষা নয়। নাথ পন্থের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই অগ্নিসাধনার মূল উদ্দেশ্য হল নেতিবাচক অভ্যাস বা পূর্বজন্মের কর্মফল পুরিয়ে ফেলা। তীব্র শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে মনের সমস্ত বিকার দূর করা। নিজের ইন্দ্রিয় ও মনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে আধ্যাত্মিক শক্তিকে জাগ্রত করাই এর লক্ষ্য। পৃথিবীতে সান্তি কায়েম রাখার লক্ষ্যে বহু ঋষি এই যজ্ঞ করে থাকেন। দীর্ঘ ২১ দিনের অগ্নি প্রজ্বলন ও তা শেষে হোম-যজ্ঞ তান্ত্রিক অনুশীলনের এক প্রাচীন পরম্পরা। রুশ দেশের মায়া ত্যাগ করে নাথ দীক্ষায় দীক্ষিত এই যোগিনী এখন বিশ্বশান্তি, মানবকল্যাণ ও আত্মশুদ্ধির কামনায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন গনগণে আগুনের পুণ্য শিখায়। এ ঘটনা তাজ্জব করেছে ভারত তথা বিশ্ববাসীকে।
