ক্রমশ তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের জেরে একের পর এক হিমবাহ উধাও! বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে তবে কি ভয়াবহ প্রকৃতিক দুর্যোগের মুখে সিকিম, উত্তরের ডুয়ার্স সহ পূর্ব হিমালয় পর্বতমালা সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল!
সম্প্রতি রিমোট সেন্সিং জার্নালে প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং জর্জিয়ার তিবিলিসির ইলিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রে এমনই ইঙ্গিত মিলেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গত পাঁচ দশকে ভুটান পাহাড়ে পাঁচশোর বেশি হিমবাহ উধাও হয়েছে। চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূগোলের গবেষক মধুসূদন কর্মকার বলেন, "গবেষণাটি হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। এটা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় রকমের হুমকি।" তিনি জানান, হিমবাহ বিলুপ্তির প্রভাবে উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার নদীগুলির অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। কারণ, শীত ও গ্রীষ্মে নদীগুলিকে টিকিয়ে রাখতে হিমালয়ের হিমবাহগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রায় একই মত কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তরের সিকিম কেন্দ্রের অধিকর্তা গোপীনাথ রাহার। তিনি জানান, হিমবাহ বিপর্যয়ের প্রভাবে উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমে তীব্র হতে পারে জলসঙ্কট এবং দেখা দিতে পারে খরার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
প্রায় একই মত কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তরের সিকিম কেন্দ্রের অধিকর্তা গোপীনাথ রাহার। তিনি জানান, হিমবাহ বিপর্যয়ের প্রভাবে উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমে তীব্র হতে পারে জলসঙ্কট এবং দেখা দিতে পারে খরার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়। দ্রুত বরফ গলতে শুরু করায় হ্রদ সম্প্রসারিত হয়ে হড়পা বাণের ঝুঁকিও বাড়ছে পূর্ব হিমালয় পর্বতমালা সংলগ্ন সিকিম, উত্তরবঙ্গ এবং অরুণাচল প্রদেশে। নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ক্রমশ তাপমাত্রার বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাবে পূর্ব হিমালয় জুড়ে বরফ কমছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একই পূর্ব হিমালয় পর্বতমালা ভারতের সিকিম এবং অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানে একই আবহাওয়া রয়েছে। এর প্রভাবে ভারতীয় অংশে ইতিমধ্যে হিমবাহ উধাও হতে শুরু করেছে।
২০২৫ সালের একটি পৃথক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভুটান সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশে পূর্ব হিমালয়ের একটি অংশে ৩২ বছরে ১১০টি হিমবাহ উধাও হয়েছে। সম্প্রতি রিমোট সেন্সিং জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণাপত্রে ১৯৭৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভুটান পাহাড়ে হিমবাহের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এই সময়ের মধ্যে ৫২৪টি হিমবাহ সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়েছে। কেবল ১৯৯৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৪৩৫টি হিমবাহ বিলুপ্ত হয়েছে। এর আগে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে ৮৯টি হিমবাহ বিলুপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ আবহাওয়া দ্রুত পাল্টাতে শুরু করায় ১৯৯৮ সালের আগে বছরে প্রায় চারটি হিমবাহ অদৃশ্য হয়েছে। ১৯৯৮ সালের পর সেটা প্রতি বছর প্রায় ১৬টিতে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের একটি পৃথক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভুটান সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশে পূর্ব হিমালয়ের একটি অংশে ৩২ বছরে ১১০টি হিমবাহ উধাও হয়েছে। সম্প্রতি রিমোট সেন্সিং জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণাপত্রে ১৯৭৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভুটান পাহাড়ে হিমবাহের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং জর্জিয়ার তিবিলিসির ইলিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ভুটানের পাহাড় জুড়ে হিমবাহ এলাকা, সেগুলোর অবস্থান এবং ধ্বংসাবশেষের আবরণের দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের মানচিত্র তৈরির জন্য বিভিন্ন সময়ের স্যাটেলাইট চিত্র এবং হিমবাহের তালিকা ব্যবহার করেছেন। তাঁরা দেখেছেন ছোট হিমবাহ, বিশেষ করে ৫ বর্গ কিলোমিটারের কম আয়তনের হিমবাহ দ্রুত হারাতে বসেছে। ভারত সংলগ্ন দক্ষিণ ভুটানে উত্তর দিকের তুলনায় বেশি হিমবাহ বিলুপ্ত হয়েছে। ১৯৭৬ সালের বেসলাইনের তুলনায়, দক্ষিণে ৯৪৭টি হিমবাহের মধ্যে ২৯৯টি অদৃশ্য হয়েছে। সেখানে উত্তরে ৯২৪টি হিমবাহের মধ্যে ২২৫টি বিলুপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৪৮ বছরে দক্ষিণ ভুটানে প্রতি বছর গড়ে ছয়টি এবং উত্তর ভুটানে প্রতি বছর পাঁচটি হিমবাহ নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের সতর্কতা, দ্রুত হিমবাহ বিলুপ্ত হওয়ায় এই অঞ্চলে জলের সঙ্কট বাড়বে। পাহাড়ি নদীগুলো শুকিয়ে অস্তিত্ব হারাবে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সূচনা করবে। হিমালয়ের হিমবাহের বরফ গলা জলে উত্তরের নদীগুলো বেঁচে থাকে। কিন্তু হিমবাহ অদৃশ্য হওয়ায় নদীগুলো শুকিয়ে যাবে। এছাড়াও হিমবাহ গলে বরফ পাতলা হওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠের নিম্নচাপ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে ছোট হ্রদে পরিণত হয়। এই হ্রদগুলি হিমবাহের ধ্বংস প্রক্রিয়া তীব্র করে তোলে। দক্ষিণ ভুটানে এই ঘটনা বেশি হচ্ছে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, হ্রদের ক্রমাগত সম্প্রসারণ আগামী দশকগুলিতে হিমবাহের ক্ষয় আরও বাড়াতে পারে। এই ঘটনা সিকিম, উত্তরবঙ্গ এবং অরুণাচল প্রদেশের মতো ভারতীয় অঞ্চলগুলির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, হিমবাহ গলে তৈরি হ্রদগুলো অস্বাভাবিকভাবে বড় হচ্ছে। সেটা কোনও কারণে জল ধরে রাখতে না-পারলে উত্তর সিকিমের লোনার্ক হ্রদের মতো বিধংসী হড়পা বানের সৃষ্টি করতে পারে।
