একই রাজ্যে দুই বিপরীত ছবি। একদিকে অনাবৃষ্টির জেরে সিকিমের (Sikkim) গ্যাংটক তীব্র জলসঙ্কটের মুখোমুখি। দাবানলে জ্বলছে মঙ্গন-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জঙ্গল। তখন রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে ছাঙ্গু সংলগ্ন উঁচু এলাকায় ভারী তুষারপাতের বিপর্যয় শুরু। তুষারপাতে আটকে পড়ে পর্যটকদের একাধিক গাড়ি। সেনাবাহিনী পর্যটকদের উদ্ধার করে। এলাকায় বরফ সরানোর কাজও চলছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে সিকিমে এমন ভিন্ন ছবি কেন? একদিকে যেখানে জলকষ্ট দেখা দিয়েছে, শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য অনাবৃষ্টিতে জঙ্গলে দাবানল দেখা দিয়েছে। তাহলে সিকিমে আবহাওয়ার বদল হচ্ছে? প্রকৃতি বদল হচ্ছে? সেই প্রশ্ন উঠেছে।
আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, সিকিমের পাকিয়ং, গ্যাংটক এবং মঙ্গন জেলায় বজ্রপাত এবং বজ্রপাতের সঙ্গে মাঝারি বৃষ্টি ও তুষারপাতের 'হলুদ' সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তর ও পূর্ব সিকিমে বৃষ্টি ও তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ সিকিমেও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তর সিকিমের মঙ্গন জেলায় ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত চলতে পারে। রবিবার সকালে হালকা বৃষ্টির পর ভারী তুষারপাত শুরু হয় পূর্ব সিকিমের নাথু-লা, ছাঙ্গু উপত্যকা, শেরথাং এলাকা ছাড়াও উত্তর সিকিমের জিরো পয়েন্ট, লাচুংয়ে। সোমবার সকালে সেনাবাহিনীর প্রেস বিবৃতিতে জনসংযোগ আধিকারিক লেফটেন্যান্ট মহেন্দ্র রাওয়াত জানান, রবিবার হঠাৎ ভারী তুষারপাত শুরু হতে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে আসে।
সিকিমে বরফ থেকে সরানো হচ্ছে গাড়ি। ছবি- সংগৃহীত
পূর্ব সিকিমে পর্যটক বোঝাই গাড়িগুলো রাস্তায় আটকে পড়ে। বেগতিক পরিস্থিতি দেখে সেনাবাহিনীর জওয়ানরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। অভিযানের নামকরণ হয়েছে ‘অপারেশন হিমরাহাত’। রাতের মধ্যে শিশু-সহ ৪৬ জন পর্যটককে অস্থায়ীভাবে থাকার জন্য ১৭ মাইলের সেনাছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর তরফে তীব্র শীত ও উচ্চতাজনিত সমস্যার প্রভাব কমাতে পর্যটকদের জন্য গরম খাবার, হিটিংয়ের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। মেডিক্যাল টিম প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে তাঁদের স্থিতিশীল বলে নিশ্চিত করে। রাতেই তীব্র তুষারপাতের মধ্যে সেনাবাহিনী দেড়শোর বেশি পর্যটকদের গাড়ি নিরাপদ জায়গায় সরানোর ব্যবস্থা করে। তবে উদ্ধার কাজ খুব একটা সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন গাড়ি চালকরা।
কারণ, ভারী তুষারপাতের জন্য অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে শেরাথাং সিপি/পিএস-এর অধীন জওহরলাল নেহেরু রোড ধরে সিপসু এবং ১৬ মাইলের সড়ক এক থেকে দেড় ফুট বরফের আস্তরণে তলিয়ে যায়। পিছল বরফে গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। জওহরলাল নেহেরু রোড ধরে সিপসু এবং ১৬ মাইলের সড়কে অন্তত সাড়ে তিনশো গাড়ি আটকে যায়। শেরাথাং এলাকায় সেনাবাহিনী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। সিপসু এবং ছাঙ্গুর মধ্যে অন্তত দেড়শো গাড়ি আটকে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নামানো হয় 'আইস কাটার' মেশিন। কিন্তু খুব একটা লাভ হয়নি। এরপর গাড়ি চালকরা বরফ গলাতে ইউরিয়া এবং লবন ছিটিয়ে দিতে শুরু করেন। রাস্তা চলাচল যোগ্য হতে আটকে পড়া পর্যটকদের গ্যাংটকে নামিয়ে আনার কাজ শুরু হয়।
লাইন দিয়ে আটকে পর্যটকদের গাড়ি। ছবি- সংগৃহীত
প্রায় তিনমাস অনাবৃষ্টির জেরে যখন রাজ্যের রাজধানী গ্যাংটক চরম জল সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে। একের পর এক নদী, ঝোরা সহ জলের চিরাচরিত উৎসগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। কুপুপ, নাথাং, মঙ্গনের শুকনো জঙ্গল দাবানলে পুড়ে খাক হচ্ছে সেই সময় রবিবার থেকে ভারী তুষারপাতের ঘটনা ঘিরে চিন্তার ভাজ পড়েছে আবহাওয়া গবেষক মহলে। আবহাওয়ার এমন 'ইউ টার্ন' ভালো লক্ষণ নয় বলেই মনে করছেন গবেষকদের একাংশ। চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ ভূগোল গবেষক মধুসূদন কর্মকার জানিয়েছেন, হিমালয় পার্বত্য এলাকাতেই আবহাওয়ার বদল হচ্ছে। সেকারণে সঠিক সময়ে তুষারপাত হচ্ছে না। অন্যদিকে, জলকষ্ট দেখা দিচ্ছে।
