ঘড়িতে তখন দুপুর দেড়টা। রাজারহাটের একটি স্টুডিওতে উৎসাহী জনতার ভিড়। লাঞ্চটাইম ভুলে একটি বার নতুন দিদিকে সামনে থেকে দেখতে চায় তারা।
আপনাকে দেখে বেশ ঝরঝরে লাগছে। ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ সিজন টেন-এ নতুন ভূমিকা কতটা উপভোগ করছেন?
- (হাসি) থ্যাঙ্ক ইউ। এই শো শুরুর আগে আমার ওজন হয়ে গিয়েছিল ৮৫ কেজি। আর এখন ৬৭ কেজি। খুবই এনজয় করছি। কাজেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এপিসোডগুলো সকলের ভালো লাগছে। সেরকমই প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। এটা খুবই হাম্বল একটা এক্সপিরিয়েন্স। কারণ, আমরা মনে করি, আমাদের জীবনের ক্রাইসিস, আমাদের খারাপ থাকাটাই শ্রেষ্ঠ খারাপ থাকা। কিন্তু এখানে প্রতিনিয়ত এত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে দশ জন করে অংশগ্রহণকারী আসছেন। তাঁদের বাড়ির লোক, বন্ধুবান্ধবরাও থাকছেন। অফ ক্যামেরা তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। তখন বুঝতে পারি, এঁদের সংগ্রাম কতটা বিশাল। আমাদের জীবনে হয়তো তেমন ক্রাইসিস ঘটবে না। উদাহরণ স্বরূপ বলছি, কাল সকালবেলা দশ মাসের বাচ্চাকে কী খাওয়াব, কঠিনতম দুঃসময়ে হয়তো এই ভাবনা হবে না বা হয়নি। একটা সাধারণ তুলনামূলক ঘটনা, যদি বলি আমার এই মাসটা খুব টানাটানি চলছে। মেয়ে তখন বলে, উই ব্রোক। আমি তখন বলি, উই আর নট ব্রোক, তবে বাইরের খাওয়াদাওয়ার খরচটা একটু কম কর। এবার আমি যদি বলি, আই অ্যাম ব্রোক, আর আম্বানি যদি বলেন, আম্বানি ইজ ব্রোক, এই দুটো ‘ব্রোক’-এর মধ্যে তো আকাশপাতাল তফাত আছে। যা আছে সেটা নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকার শিক্ষাটা আগেও ছিল, এই মঞ্চে এসে সেই শিক্ষাটা আরেকটু বৃদ্ধি পেল।
প্রচুর মেয়েরা, দিদিরা আছেন যাঁরা নিজেরা কাজ করে বরেদের টোটো কিনে দিয়েছেন। সেই টোটো চালিয়ে বর উপার্জন করছেন। আর আমরা অনেকেই যেমন ভাবি, ডিভোর্স বিষয়টা শুধু শহুরে লোকেদের হয়,...
এই শো-এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের কথা উঠে আসে। শো-তে এসে অনেক মেয়েরা খেলার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারছেন। অথচ এখনও সিংহভাগ মহিলাদের হাতে মাসিক খরচের টাকাটা থাকে না। তাঁদের বাড়ির পুরুষের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এই জায়গাটা কীভাবে দেখেন?
- এই শো-টা করতে এসে আমার অনেক ধারণা বদলেছে। এখন মহিলারা কিন্তু অনেক বেশি স্বাবলম্বী। আমাদের এখানে যাঁরা খেলতে আসছেন, তাঁদের টিকে থাকার লড়াইটা আমরা দেখানোর চেষ্টা করছি। যাঁরা আমাদের এখানে এখনও অবধি খেলতে এসেছেন, তাঁদের ষাট শতাংশ বরেদের যখন কাজ চলে গিয়েছে বা বর অসুস্থ বা বাবা মারা গিয়েছেন বা মহিলার বিয়ে হয়নি, তেমন পরিস্থিতিতে সেই সব মেয়েরা স্কুলে পড়ার সময় থেকে উপার্জন করছেন। প্রচুর মেয়েরা, দিদিরা আছেন যাঁরা নিজেরা কাজ করে বরেদের টোটো কিনে দিয়েছেন। সেই টোটো চালিয়ে বর উপার্জন করছেন। আর আমরা অনেকেই যেমন ভাবি, ডিভোর্স বিষয়টা শুধু শহুরে লোকেদের হয়, আমাদের এখানে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে অনেক নারী এসেছেন যিনি বলেছেন, আমি একা মা। বা আমি বাপের বাড়ি চলে গিয়েছি।
টলি অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। ছবি: রাজীব চক্রবর্তী।
আপনিও সন্তানকে একলাই বড় করেছেন। কাজেই এই লড়াইটার সঙ্গে নিশ্চয়ই কানেক্ট করতে পারেন?
- একদম। সেই জন্যই হয়তো নিজেকে খুব সাধারণ মনে করি। অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে মিশে যেতে তাই আমার অসুবিধা হচ্ছে না। আমি একেবারেই ভাবি না, আমি এই শোয়ের সঞ্চালিকা বা আমার একটা আলাদা ব্যাপার আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার ব্যক্তিত্ব এমন নয়, সেই জন্য আমি এমন অনেক কথা বলি, যেটাতে প্রতিযোগীরাও বলে যে এরকম হয়।
মানুষের অভ্যেসই হচ্ছে না-দেখে, না-বুঝে প্রথমেই মন্তব্য করা। সেই ধরনের কমেন্ট কিন্তু শো শুরু হওয়ার পর পাচ্ছি না। আমি কোনওদিন মনে করি না রচনাদি যেটা করে গিয়েছে...
আপনি নিজে টালিগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হয়েও দেখেছি এখনও অটো চাপেন।
- হ্যাঁ, রাস্তায় হাঁটিও। এর মধ্যেই ডাবিং করতে গিয়েছিলাম লেক সিসিডির পাশে। রাত্রি সাড়ে ন’টা-পৌনে দশটার সময় হেঁটেই বাড়ি ফিরেছি। ভাবলাম ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর চক্করে অনেকদিন হাঁটাহাঁটি করা হয়নি। তাই একটু হেঁটে নিলাম।
এই শোয়ের পনেরো বছরের প্রতিষ্ঠিত মুখ ছিল। সেই মুখ সরার পর আপনি এসেছেন। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা চলে আসছে। সেটা কীভাবে সামলাচ্ছেন?
- যখন টেলিকাস্ট শুরুই হয়নি, তখনই তুলনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে। মানুষের অভ্যেসই হচ্ছে না-দেখে, না-বুঝে প্রথমেই মন্তব্য করা। সেই ধরনের কমেন্ট কিন্তু শো শুরু হওয়ার পর পাচ্ছি না। আমি কোনওদিন মনে করি না রচনাদি যেটা করে গিয়েছে সেটা আমি করতে পারব। আমি আমার মতো করে চেষ্টা করছি।
ফেসবুকটাকে আমি নর্দমা ভাবি। আমার মনে হয়, কেউ যখন কাউকে ছোট করে, তখন ভাবে যে, এই কথাটা বলে দিলাম, গায়ে লেগে গেল! আমি জিতে গেলাম।...
আপনার চমৎকার স্পোর্টিং অ্যাটিটিউড দেখেছি। কেউ যখন বলছে, রাক্ষসীর মতো লাগছে। আপনি তখন বলেছেন শাঁকচুন্নির মতো। এই হিউমার বাঁচিয়ে রাখলেন কী করে?
- (জোরে হাসি) আমি জাস্ট এইরকমই। ফেসবুকটাকে আমি নর্দমা ভাবি। আমার মনে হয়, কেউ যখন কাউকে ছোট করে, তখন ভাবে যে, এই কথাটা বলে দিলাম, গায়ে লেগে গেল! আমি জিতে গেলাম। আমি মনে করি ওটা আমাদের গায়ে মাখা উচিত নয়। তুমি আমাকে যা খুশি বলো না কেন, আমি তো সেটা নই। তুমি আমাকে যদি বলো রাক্ষসী, আমি তোমাকে বেটার অপশন দিচ্ছি। আর আমি তো শাঁকচুন্নির চরিত্রে করেছি (‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ : কদলীবালা)। তার চেয়ে পপুলার কোনও চরিত্র আমি জীবনে করিনি। ফলে ক্ষতি কী।
আমার মতো করে চেষ্টা করছি, রচনাদির মতো নয়: স্বস্তিকা
মাঝে আপনি পুরী গেলেন। আর বম্বে, অজন্তা-ইলোরা?
- পুরী গেলাম, বম্বে এখন যাইনি। আর অজন্তা-ইলোরা আগের বছর গিয়েছিলাম। রথের সময় পুরী গিয়েছিলাম কারণ, গুণ্ডিচাতে ঠাকুর দর্শন আমার কখনও করা হয়নি, অথচ জীবনে বোধহয় পঁচাত্তরবার পুরী গিয়েছি। এটা প্রথমবার হল।
জীবন কেমন এখন?
- জীবন মানেই ‘জি বাংলা’ (জোরে হাসি)।
ডেট করছেন কাউকে?
- অনেককে।
ইন্সটাগ্রামে দেখলাম একজনের নিখুঁত ছবি তুলতে আপনি বারো ঘণ্টা সময় নিয়েছেন। তিনি নিজেও পোস্ট করেছেন। আপনি তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
- আমি এরকম অনেক ছবি খুঁজে খুঁজে অন্যদেরও পোস্ট করি। একজনের নয়। উনি পুরুষ মানুষ বলে মানুষের মনে হচ্ছে।
সে কি আপনার বন্ধু?
- খুবই ভালো বন্ধু।
পালাবদলের পর ইন্ডাস্ট্রির মানুষ হিসাবে বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
- কিছুই দেখছি না। যখন পালাবদল হয়নি তখনও কিছুর মধ্যে ছিলাম না। এখনও নেই।
