শহরের হইহল্লার থেকে অনেক দূরে এক শান্ত পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুতদর্শন শিব মন্দির। চারদিক রঙে মোড়া হলেও এই মন্দিরের গায়ে কিন্তু এক বিন্দুও রং নেই। ধাতব তার এবং সিমেন্ট ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে সমগ্রটি। মহাদেবের মাথাভর্তি জটা, দেহে পেঁচিয়ে থাকা সাপটি থেকে শুরু করে, দেবাদিদেবের উদ্দেশে অর্পিত প্রতিটি গাঁদা ফুল সিমেন্ট দিয়েই তৈরি। যেন অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্টকে সম্বল করেই নির্মাণ কাজ চালিয়ে গিয়েছেন শিল্পী। এ দেশেই রয়েছে এই অন্যরূপের মন্দির। গড়নের মতোই যার নেপথ্য় কাহিনিও বিস্মিত করবে।
যেন অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্টকে সম্বল করেই নির্মাণ কাজ চালিয়ে গিয়েছেন শিল্পী। মন্দিরের একেবারে চূড়ায় ধাতব তার পেঁচিয়ে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে কয়েকটি শব্দ— ‘টেম্পল ইন মাই ড্রিম’। অর্থাৎ ‘আমার স্বপ্নে দেখা শিব মন্দির’। এই পর্যন্ত দেখে যে কোনও দর্শক অথবা পর্যটকের মনে নানা প্রশ্ন জেগে ওঠে এই শিব মন্দির নিয়ে। সেসবের উত্তর দিতে পারবেন বর্ষীয়ান শিল্পী সত্য ভূষণ, যিনি নিজের জীবনের ৩৮ বছর ব্যয় করেছেন এই মন্দির তৈরিতে!
প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো যে এই মন্দির গড়ে উঠেছে হিমাচল প্রদেশে। প্রতি বছর যে দেড় কোটি পর্যটক আসেন হিমাচলে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই চইল হিল স্টেশন দেখতে আসেন। তবে তাঁদের মধ্যে খুব কম পর্যটকই জানেন কুম্ভ শিব মন্দিরের (shiv temple) হদিশ। এই সেই মন্দির।
শুনলে চমকিত হতে হয়, সমগ্র মন্দিরটি তিল তিল করে একা হাতে গড়ে তুলেছেন সত্য ভূষণ। ১৯৮০ সাল থেকে শুরু হয়েছে নির্মাণকাজ। নিজের সর্বস্ব ব্যয় করে তিনি জমি কিনেছেন, নির্মাণ সামগ্রী কিনেছেন মন্দিরের জন্য। আর তারপর দিনরাত এক করে কাজ করে গিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে কেবল স্থানীয়রাই জানত মন্দিরটির কথা। পরবর্তীকালে লোক জানাজানি হলে, অনেকেই এগিয়ে এসে মুক্ত হস্তে দান করেন। বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে কুম্ভ শিব মন্দির তৈরিতে।
কিন্তু কেন? কী কারণে এমন কৃচ্ছসাধন শিল্পীর? সত্য ভূষণ জানান, ৩৮ বছর আগে স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক মন্দিরের! ঘুম ভেঙে স্থির করেছিলেন, নির্মাণ করবেন নিজ হাতেই। স্কুলে পড়তে মাটি ও কাঠের মূর্তি তৈরি, খোদাইয়ের কাজ প্রভৃতি শিখেছিলেন। সে শিক্ষাকেই কাজে লাগান এই ক্ষেত্রে। যদিও প্রাথমিকভাবে বহু মানুষের হাসির পাত্র হন তিনি। বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকেই ষাটোর্ধ এই বৃদ্ধ শিল্পী মন্দির থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরত্বে বাস করেন। জানলা দিয়ে যখনই দেখতে পান, কোনও পর্যটক মন্দির দর্শন করতে থেমেছেন, দ্রুত চলে আসেন মন্দির প্রাঙ্গনে। সুইচ টিপে চালিয়ে দেন আলো, জলের ফোয়ারা আর মিউজিক সিস্টেম।
এই শিব মন্দির যে একেবারেই অন্যধারার, তা বলা বাহুল্য। হিমাচল প্রদেশের চইলে বেড়াতে গেলে, এই শিল্পসৃষ্টি চাক্ষুষ করার সুযোগ পাবেন যে কোনও পর্যটক।
