shono
Advertisement

Breaking News

Hotspot Noapara

'বাহুবলী' অর্জুনের সঙ্গে সম্মুখ সমরে 'তরুণ তুর্কি' তৃণাঙ্কুর! নোয়াপাড়ায় মঞ্জু-কাঁটা বিঁধবে ঘাসফুলকে?

একটা সময় শহরতলির এই কেন্দ্র বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। রাজ্যে পালাবদলের পর অবশ্য এই কেন্দ্রে তৃণমূল বার দু'য়েক জিতেছে। বাম সমর্থিত কংগ্রেস জিতেছে একবার।
Published By: Subhajit MandalPosted: 05:33 PM Apr 22, 2026Updated: 05:33 PM Apr 22, 2026

২৬ বছর হয়ে গেল। নোয়াপাড়ার ভোটে আজও যেন অদৃশ্য ফ্যাক্টর বিকাশ বসু। ২০০০ সালের পয়লা এপ্রিল ইছাপুরে খুন হন বিকাশ বসু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৎকালীন ঘনিষ্ঠ অনুগামী বিকাশ বসুকে গুলি করে খুন করা হয়। সেসময় রাজ্য রাজনীতি রীতিমতো আলোড়িত হয়। যার প্রভাবে আমূল বদলে যায় নোয়াপাড়ার রাজনীতি। ১৯৭৭ সাল থেকে টানা সিপিএমের দখলে থাকা এই কেন্দ্র ২০০১ সালে বামেদের ভরা জোয়ারে আচমকা ভাটার টান এনেছিল বিকাশ-হত্যাই। সেবার নোয়াপাড়া থেকে প্রথম জিতে আসেন বিকাশপত্নী মঞ্জু বসু।

Advertisement

নোয়াপাড়ার বিদায়ী বিধায়ক মঞ্জু বসু।

আড়াই দশক আগের সেই হত্যাকাণ্ড আজও নোয়াপাড়ার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক। বলা ভালো, অন্যতম প্রধান ইস্যু। সেসময় বিকাশ হত্যায় তৃণমূলেরই নেতা অর্জুন সিংকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অর্জুন এখন নোয়াপাড়ার বিজেপি প্রার্থী। আর বিকাশের স্ত্রী মঞ্জু বসু তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক। কিন্তু এবার দল তাঁকে টিকিট দেয়নি। শুধু তাই নয়, তাঁকে অপমান করা হয়েছে বলেও মঞ্জু বসু অভিযোগ করেছেন। তৃণমূল প্রার্থী করেছে দলের তরুণ মুখ, তৃণমূলের ছাত্র পরিষদের সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে। বিকাশ বসুর ছবি দেওয়া উত্তরীয় গলায় ঝুলিয়ে প্রচার করছেন তিনি। সিপিএম এবার নোয়াপাড়া কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে ট্রেড ইউনিয়ন নেত্রী গার্গী চট্টোপাধ্যায়কে। কংগ্রেস প্রার্থী দলের মুখপাত্র অশোক ভট্টাচার্য।

অর্জুন সিং। ফাইল ছবি।

কলকাতার উপকণ্ঠে নোয়াপাড়ার অর্থনীতি শিল্পাঞ্চল এবং মহানগরীতে চাকরির উপর নির্ভরশীল। মূলত মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তদের বাস। প্রায় ২ লক্ষ ৪৬ হাজার ভোটার নোয়াপাড়ায়। প্রায় ৮৯ শতাংশ হিন্দু ভোটার। সংখ্যালঘু ভোটার ১১ শতাংশের আশেপাশে। SIR-এ বাদ গিয়েছে হাজার আটেকের কিছু বেশি নাম।  গারুলিয়া এবং উত্তর বারাকপুর দুটি পুরসভা রয়েছে নোয়াপাড়ার অধীনে। এর মধ্যে গারুলিয়া পুরসভায় হিন্দিভাষী ভোটারের আধিক্য। মূলত ভিনরাজ্য থেকে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকের কাজ করতে এসে এই এলাকাগুলিতে বসতি স্থাপন করে হিন্দিভাষীরা। আবার উত্তর বারাকপুরে মূলত তথাকথিত বাঙালি 'ভদ্রলোকে'দের বাস।

একটা সময় শহরতলির এই কেন্দ্র বামেদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। রাজ্যে পালাবদলের পর অবশ্য এই কেন্দ্রে তৃণমূল বার দু'য়েক জিতেছে। বাম সমর্থিত কংগ্রেস জিতেছে একবার। কংগ্রেস বিধায়কের মৃত্যুতে যে উপনির্বাচন হয় তাতে আবার জেতে তৃণমূল। সংগঠনিকভাবে এই এলাকায় শাসকদল মহাশক্তিশালী। স্থানীয় ইস্যুর মধ্যে রাস্তাঘাটের সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অধিকাংশ কলকারখানার রুগ্ন দশা কাজ করবে। গঙ্গার ঘাটগুলি বাঁধানো নিয়ে সমস্যা শোনা যায়, নিকাশি সমস্যাও কিছুটা রয়েছে। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে নোয়াপাড়ার এবারের ভোট কতগুলি চরিত্রের। সেই চরিত্রগুলিকে পছন্দ বা অপছন্দ করার ভোট।

প্রচারে তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য। ফাইল ছবি।

অর্জুন সিং। একটা সময় গোটা বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলের হর্তাকর্তা ছিলেন তিনিই। কিন্তু বারবার দলবদল এবং বাহুবলি ধাঁচের রাজনীতি অর্জুনের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটা কমিয়েছে। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে পরাস্ত হয়েছেন। এলাকায় একচ্ছত্র দাপট আর নেই। যদিও অর্জুন ঘনিষ্ঠদের দাবি ভাটপাড়া এবং নোয়াপাড়ায় এখনও তাঁর ভালো প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে হিন্দিভাষীদের মধ্যে। ভাটপাড়ায় এবার বিজেপির প্রার্থী অর্জুনের ছেলে পবন। আর অর্জুন নিজে লড়ছেন নোয়াপাড়ায়। ওই কেন্দ্রের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মঞ্জু বসু। ৩ বারের বিধায়ক। এবার দল টিকিট দেয়নি। তৃণমূল প্রার্থী তৃণাঙ্কুর যে বিকাশ বসুর মৃত্যুরহস্যকে অর্জুনের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চাইছেন, সেই লিগ্যাসির উত্তরাধিকারী মঞ্জু বসু নিজেই। তিনিই কিছুদিন আগে 'দল ছেড়ে' অভিযোগ করেছেন, বিকাশ বসু সুবিচার পাননি। প্রশ্ন করেছেন. বাম আমলে যে ফাইল চাপা পড়ে গিয়েছিল, সেই ফাইল তৃণমূল কেন খুলল না? এলাকায় মঞ্জুর প্রভাব রয়েছে। রাজনীতি থেকে অবসর ঘোষণা করলেও তাঁর 'অপমান' তৃণমূলের বিপক্ষে যেতে পারে। চরিত্র ৩, সুনীল সিং। অর্জুনের আত্মীয়। কখনও তিনি তৃণমূলে, কখনও বিজেপিতে। আশায় ছিলেন মঞ্জু টিকিট না পেলে তাঁর ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে। কিন্তু নেত্রী টিকিট দেননি। গারুলিয়া পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান এখন অর্জুনের সঙ্গে বিজেপির প্রচার করছেন। চরিত্র ৪, পার্থ ভৌমিক। অর্জুন সিং বিজেপিতে যাওয়ার পর বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলের রাশ এখন তাঁর হাতে। নোয়াপাড়ার বাঙালি ভোটারদের মধ্যে পার্থর প্রভাব অনস্বীকার্য। তৃণমূলের প্রার্থী তৃণাঙ্কুর পার্থর কাছের বলেই প্রচার করছে গেরুয়া শিবির। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আড়াল থেকে পার্থও লড়ছেন তৃণাঙ্কুরের হয়ে। এবার আসা যাক তৃণাঙ্কুরের নিজের কথায়। তিনি নিজে রাজনীতিতে অর্জুন, মঞ্জু, সুনীল, পার্থদের মতো অভিজ্ঞ না হলেও তারুণ্যে উজ্জ্বল। যুব সমাজের একটা অংশের সমর্থন করছেন। অর্জুনের বাহুবলি ভাবমূর্তির কাছে নিতান্তই 'নিরীহ'। যা বাঙালি ভোটারদের মধ্যে তাঁকে অ্যাডভান্টেজ দিতে পারে। যদিও অর্জুন তৃণাঙ্কুরকে প্রতিদ্বন্দ্বী মানতে নারাজ। তাঁর কথায়, "তৃণাঙ্কুরকে যদি আমি প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দের অপমান। দেখবেন ভোটের আগেই ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাবে।" কিন্তু নোয়াপাড়ার লড়াইয়ে বাহুবলী অর্জুনের সামনে মাথা নোয়াতে নারাজ তৃণাঙ্কুরও। তিনিও মাটি কামড়ে প্রচার করছেন। মানুষের কাছে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, "মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে। উন্নয়নের পক্ষে।" 

তৃণাঙ্কুর প্রচার করছেন বিকাশ বসুর ছবি হাতে। বলছেন, 'খুনিকে ভোট দেবেন না।' নোয়াপাড়ার মানুষের কাছে তাঁর আর্জি, এলাকার শান্তিশৃঙ্খলার জন্য তৃণমূলের পাশে থাকুন। উলটে অর্জুন বলছেন, "মঞ্জুদিকে বেইজ্জত করে, ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানকার মানুষ এর সঠিক জবাব দিয়ে দেবে। নোয়াপাড়ায় পরিবর্তন হচ্ছেই।" কিন্তু এই পরিবর্তনের পথে আরও কাঁটা রয়েছে। বাম প্রার্থী গার্গী রায়চৌধুরীর এলাকায় প্রভাব রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি শ্রমিকদের মধ্যেও প্রভাবশালী। অবাঙালি শ্রমিকরাও তাঁকে চেনেন। কংগ্রেসেরও এলাকায় সামান্য কিছু পকেটে ভোট রয়েছে।

প্রচারে গার্গী চট্টোপাধ্যায়। ফাইল ছবি।

ফলে তৃণমূল বিরোধী সব ভোট যে অর্জুনের ঝুলিতেই পড়বে, তেমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। আবার তৃণমূলের একটা বিক্ষুব্ধ অংশের ভোটের যে আশা অর্জুন করছেন, সেটা যে সরাসরি তাঁর দিকে না গিয়ে এই দুই প্রার্থীর ঝুলিতে পড়বে না, সেটাও নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায় না। 

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement