shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

ন্যানো থেকে আলু! ক্ষোভ আর আশার দোলাচলে হুগলিতে কার পাল্লা ভারী?

নদীর পাড় ঘেঁষা এই জমিতে ঘাসফুলের ছড়াছড়ি। তবে আশা ছাড়েনি পদ্ম। ২১-এ যা সম্ভব হয়নি, ২৬-এ কি তা হবে?
Published By: Kousik SinhaPosted: 04:07 PM Apr 27, 2026Updated: 04:07 PM Apr 27, 2026

ফরাসি সংস্কৃতি এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জেলায়। ভাগীরথী যেখানে এসে নাম পেল হুগলি, 'পরিবর্তন' এসেছিল এই জেলা থেকেই। একরের পর একর কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করে তৃণমূল নেত্রীর সেই আন্দোলন শুধু বাংলার নয়, বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে জায়গা পেয়েছে। আবার ১৮ বছর পর সেই জমি থেকেই বোধহয় আরও একটা 'পরিবর্তন'-এর ডাক দিতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তাই ভোট ঘোষণার অনেক আগেই সেই সিঙ্গুরে গিয়ে সভা করেছিলেন তিনি। নদীর পাড় ঘেঁষা এই জমিতে ঘাসফুলের ছড়াছড়ি। তবে আশা ছাড়েনি পদ্ম। ২১-এ যা সম্ভব হয়নি, ২৬-এ কি তা হবে?

Advertisement

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নদীমাতৃক জেলায় তৃণমূলের কতৃত্ব যে বহাল আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০১৯-এ হুগলি লোকসভা কেন্দ্রে পদ্ম ফুটিয়ে, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে সেই আধিপত্যে কিছুটা দখল দিতে চেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু সেই আশাও ভঙ্গ হয়ে যায় ২০২৪-এ। আপাতত জেলার চারটি বিধানসভা কেন্দ্র বাদে সবটাই তৃণমূলের হাতে। গড় ধরে রাখতে অঙ্ক কষেই কোথাও কোথাও প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল। টিকিট দেওয়া হয়েছে দেবাংশু ভট্টাচার্য, শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তরুণ প্রার্থীদের। তবে, এই জেলায় যে বিরোধীদের নজর রয়েছে, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।

নির্বাচনের আগে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সিঙ্গুরের জমিতে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। অমৃত ভারত ট্রেনের উদ্বোধন, তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল লাইন থেকে শুরু করে ৮৩০ কোটির প্রকল্পে ভরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর অমিত শাহ থেকে রাহুল গান্ধী, শীর্ষস্তরের রাজনীতিকদের আনাগোনা দেখা গিয়েছে প্রচারে। সিপিএমও তাদের তরুণ ব্রিগেডের অন্যতম মুখ মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে এই জেলায় লড়াইয়ের সুযোগ দিয়েছে। আলু থেকে ধান-কৃষি যে জেলার ভিত্তি, সেই জেলায় ঘুরে ফিরে আসে শিল্পের কথা। সিঙ্গুর থেকে হিন্দমোটর। আজও এই জেলার রাজনৈতিক বার্তায় বারবার উঠে আসে শিল্প। বিরোধীরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তৃণমূলের দিকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।

কেন্দ্র বিশ্লেষণ-

হুগলির কথা উঠলেই প্রথমেই মনে আসে সিঙ্গুরের কথা। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আজ সেই নেতাই তৃণমূলে নেই, যে নেতার হাত ধরে রূপ পেয়েছিল সিঙ্গুরের আন্দোলন। ২০০১ থেকে যিনি গড় তৈরি করেছিলেন সিঙ্গুরে, সেই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ২০২১-এ টিকিট না পাওয়ার পর যোগ দেন বিজেপিতে। বিজেপির টিকিটে লড়ে পরাজিত হন, আন্দোলনের আর সৈনিক বেচারাম মান্নার কাছে। সিঙ্গুর ধরে রাখার 'পুরস্কারে' প্রথমবার জিতে মন্ত্রী হয়ে যান বেচারাম। বেচারামের স্ত্রী তথা হরিপালের বিধায়ক করবী মান্না এবারও টিকিট পেয়েছেন একই কেন্দ্র থেকে।

ইন্দ্রনীল সেনের হাত ধরে চন্দননগরে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে তৃণমূল। একুশের ভোটেও বিপুল ভোটে জয়ী হন ইন্দ্রনীল। চাঁপদানি, তারকেশ্বর, জাঙ্গিপাড়ায় তৃণমূলের ঘাঁটি বেশ পোক্ত। এদিকে, চুঁচুড়ায় ফরওয়ার্ড ব্লকের তৈরি দূর্গে যিনি ঘাসফুল ফুটিয়েছিলেন, সেই অসিত মজুমদার এবার টিকিট পাননি। পাঁচবারের সাংসদ নরেন দে-কে হারিয়ে তৃণমূলকে চুঁচুড়া দিয়েছিলেন অসিত। সেই কেন্দ্রে এবার টিকিট দেওয়া হয়েছে দেবাংশু ভট্টাচার্যকে।

শুধু দেবাংশু নয়, জেলায় রয়েছে তৃণমূলের একাধিক নতুন প্রার্থী। ২০২১-এ পাণ্ডুয়া প্রথমবার তৃণমূল আসন পায়। বিধায়ক হন রত্না দে নাগ। এবার সেখানে তৃণমূলের টিকিট পেয়েছেন সমীর চক্রবর্তী। সপ্তগ্রামে তপন দাশগুপ্তর জায়গায় টিকিট পেয়েছেন প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসু, উত্তরপাড়ায় আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কাঞ্চন মল্লিকের কেন্দ্রে এবার তিন দলেরই নতুন প্রার্থী। শীর্ষণ্যর প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিএমের মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ও বিজেপির দীপাঞ্জন চক্রবর্তী। এনএসজি-র পোশাক পরে প্রচারে নেমে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। শ্রীরামপুর থেকে লড়ছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার।

তবে চার কেন্দ্র নিয়ে সতর্ক তৃণমূল। বিজেপির হাতে থাকা গোঘাট, খানাকুল, পুরশুড়া, আরামবাগ ঘাসফুলের মাথাব্যাথার কারণ। সেইসঙ্গে বলাগড়েও তৃণমূলের জোর খুব বেশি নয়। আগেরবার মাত্র ৬ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী। তারপর অনেক মান-অভিমানের পালা চলেছে। এবার টিকিট পাননি মনোরঞ্জন। ফলে এই কেন্দ্রেও বিজেপির নজর তীক্ষ্ণ। অন্যদিকে এবার হটসিট তারকেশ্বর। মহাদেবের ভূমিতে লড়াই এই বছর ত্রিমুখী। একদিকে বিজেপির সন্তু পান, অন্যদিকে তৃণমূলের রামেন্দু সিংহ রায়ের মুখোমুখি বামপ্রার্থী আদেশ খামরুই। লড়াই এই কেন্দ্রে এবার হাড্ডহাড্ডি হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।

কেমন আছে সিঙ্গুর?

আন্দোলনের হাত ধরে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। কেউ কর্মী থেকে হয়েছেন মন্ত্রী, কেউ কেউ অর্থনৈতিক লাভেরও মুখ দেখেছেন। জমি ফিরে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন জমির মালিকরা। চাষবাসও শুরু হয়েছে একাংশে। তবে যে বহুফসলি জমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁচাতে চেয়েছিলেন, ১৮ বছর পরও তার একাংশে কৃষিকাজ শুরু করা যায়নি। প্রশ্ন করা হলে কেউ কেউ বলেন, 'কবে ফসল ফলবে?' টাটার ছেড়ে যাওয়া জমি নিয়ে হয়ত আরও একটু আশা ছিল সাধারণ মানুষের। স্কুল, হাসপাতাল নিয়েও রয়েছে দাবি। তবে সবথেকে বড় দাবি হল কর্মসংস্থান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য সিঙ্গুরকে ভোলেননি। অনশন করে যে জমি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে ছুটে যান বারবার। ৯৯৭ একর জমি অনিচ্ছুক কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেয় রাজ্য মন্ত্রিসভা। ওয়্যারহাউস প্রকল্পে মিলেছে সম্মতি। নাহার ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে। তৈরি হচ্ছে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। সংস্থাকে ৯৯ বছরের জন্য লিজে ১১.৩৫ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্টের মতো ই-কমার্স সংস্থার পরিষেবা আরও মসৃণ হবে বলেই মনে করছে রাজ্য।

অপেক্ষায় হিন্দমোটর

লোকসভা নির্বাচনের সময় এসে হিন্দমোটরকে নতুন করে শিল্পের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু কিছুই হয়নি। সম্প্রতি কোন্নগরের সভায় ফের সেই একই কথা শোনা গিয়েছে অমিত শাহের গলায়। বলেছেন, 'ক্ষমতায় এলে শিল্প ফিরে আসবে। কর্মসংস্থান হবে।’ তবে হিন্দমোটর ঘিরে যাঁদের জীবন-জীবিকা চলত একসময়, তাঁরা বলছেন, 'এসব শুধুই ভোটের কথা। ভোট আসে-যায়, আমাদের অন্ধকারেই থেকে যেতে হয়।' তবে সম্প্রতি রাজ্য সরকার আদালতের নির্দেশে বিড়লাদের জমি লিজ নিয়েছে। একাংশে কাজ শুরু করেছে 'টিটাগড় ওয়াগন'। আবার নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বলে মনে করছেন অনেকেই।

আলুচাষিদের চোখের জল মুছবে কে?

সিঙ্গুর থেকে তারকেশ্বর, হুগলির গ্রামীণ রাজনীতিতে আলুর ফলন এবং বাজারদরই অনেক ক্ষেত্রে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দেয়। অন্য রাজ্যে আলু পাঠানো নিয়ে রাজ্য সরকারের কড়াকড়ি শুরু হওয়ায়, ভিনরাজ্যের বাজারে চাহিদা কমেছে ফলে ধাক্কা খেয়েছেন আলু চাষিরা। সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত আলু রাখার জায়গা নেই হিমঘরে। এই পরিস্থিতির দায় নিয়ে ভোটের মুখেই রাজনৈতিক চাপানউতোর দেখেছে রাজ্যবাসী। চাষিদের খরচটুকুই ওঠেনি, লাভ তো দূরের কথা। কৃষকের আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষের আশ্বাস সঙ্গে নিয়েই বুথমুখী হবে আরামবাগ, তারকেশ্বরের মানুষ। বিজেপি সরকার গড়লেই সব আলু বাইরে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন অমিত শাহ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে এসেছেন, আলুচাষিদের সুরক্ষার কথা মাথায় রয়েছে তাঁর। গবেষণাগার তৈরির কথাও বলেছেন তিনি। চোখের জল মুছবে তো? একটাই প্রশ্ন আলু-চাষিদের।

গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে কাঁটা?

এক বিধায়ক লিখলেন ‘চরিত্রহীন’, ‘লম্পট'। আর এক বিধায়ক বলে দিলেন, 'ওদের রাজনীতিতে জন্ম আমার হাতে।' গত পাঁচ বছরে এমন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চেহারা দেখেছে হুগলি জেলার তৃণমূল নেতৃত্ব। কখনও অসিত মজুমদার সরাসরি আক্রমণ করছেন বেচারাম মান্না, স্নেহাশিস চক্রবর্তীকে। আবার কখনও সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অসিতের দ্বন্দ্ব চরম আকার নিতে দেখা গিয়েছে। গত এক বছর ধরে বিভিন্ন ইস্যুতে রচনা এবং অসিতের দূরত্ব বেড়েছে। কেউ কারও কর্মসূচিতে যান না। কার্যত মুখ দেখাদেখি বন্ধ। খোদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনের হাত মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত টিকিট পাননি অসিত মজুমদার। সেটাও কি গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফল? সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে ভোটবাক্সে কোনও প্রভাব পড়বে কি না, সেটাই এখনও সবথেকে বড় প্রশ্ন।

বড় ফ্যাক্টর ফুরফুরা শরিফ

হুগলির রাজনীতিতে অন্যতম বড় ফ্যাক্টর ফুরফুরা শরিফ। রাজ্যের তথা দেশের সংখ্যালঘুদের কাছে অতি পবিত্র এই ফুরফুরা। তাই পীরজাদাদের বার্তা সংখ্যালঘু সমাজে সবসময় একটা আলাদা প্রভাব ফেলে বলেই মনে করে রাজনৈতিক মহল। পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীকে সব রাজনৈতিক দলই কার্যত সমীহ করে। শাসক তৃণমূলের সঙ্গে ত্বহার ঘনিষ্ঠতাই আলোচিত হত সবসময়। কিন্তু গত বিধানসভা নির্বাচনের পর জাঙ্গিপাড়ার বিধায়ক স্নেহাশিস চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে বারবার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। প্রশ্ন ওঠে তৃণমূলের সঙ্গে কি দূরত্ব বাড়ছে ফুরফুরার? তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত বছরও গিয়েছিলেন ফুরফুরায়। তারপরই ফুরফুরার ঘরের ছেলে পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকী যোগ দেন তৃণমূলে। এবার তিনি তৃণমূলের প্রার্থী। তবে ফুরফুরার অন্দরেও রয়েছে ভাঙন। আবার এই ফুরফুরারই অন্যতম পীরজাদা আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। তাই ফুরফুরার ভোট এবার কোনদিকে, তা বলা কঠিন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement