উত্তর কোরিয়া দেশটা যেন বেলজারের তলায় চাপা পড়া এক আশ্চর্য দেশ। যাকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। শোনা যায়, রাষ্ট্রশক্তির রক্তচক্ষুতে সেখানে জনজীবনের হাল এমনই, মানুষ পালাতে পারলে বাঁচেন। কিন্তু দেশটা যেন এক কয়েদখানা। পালানোর উপায় নেই! কিন্তু ইচ্ছে থাকলে উপায়ই হয়। সেজন্য চাই অপেক্ষা। সেদেশের এক পরিবার জানিয়েছে, কীভাবে একদশকের পরিকল্পনার পরে তারা দেশ ছেড়ে পালাতে পেরেছিলেন। অভিযানটি ছিল ঘণ্টা দুয়েকের।
২০২৩ সালের ৬ মে ৯ সদস্যের ওই পরিবার ছোট্ট মাছধরার বোটে চেপেই দেশের জলসীমা পেরিয়ে যান। কাজটা ছিল অসম্ভব কঠিন। সামান্য ভুলত্রুটি থাকলেই ধরা পড়তে হত। আর তারপর তাঁদের জন্য কত কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করে থাকত, তা ওয়াকিবহাল মানুষ মাত্রেই জানেন।
জানা গিয়েছে, এই পরিকল্পনা যাঁর, তিনি অবশ্য সশরীরে উত্তর কোরিয়া ছাড়তে পারেননি। কেননা আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তবু দুই ভাই কিম ইল-হিয়ক ও কিম ই-হিয়ক তাঁদের বাবার অস্থিভস্ম সঙ্গে রেখেছিলেন বোটে। আসলে পরিকল্পনা পুরোটাই ছিল নিখুঁত। কেননা একদশক ধরে সেই নীল নকশা তৈরি হয়েছিল। কিম ই-হিয়ক উপকূলে প্রায়ই যেতেন। শিখেছিলেন মাছ ধরা। আর তারপর কিনেছিলেন নিজস্ব বোট। উদ্দেশ্য, যাতে মৎস্যজীবী ছাড়া তাঁকে অন্য কিছু না মনে করে জলসীমায় থাকা রক্ষীরা। পরবর্তী সময়ে দুই ভাই মিলে সমুদ্রে গিয়ে মাছও ধরেছেন। দেখেছেন টহলের ধরন, জলসীমায় থাকা সেনার তৎপরতা ইত্যাদি। তারপরই তাঁরা চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছেন পালানোর।
আর পালানোর দিন রাতটাকেও বেছে নেওয়া হয় হিসেব কষে। সেরাতে এমন ঝড় হচ্ছিল, রাডার কাজ করছিল না। এদিকে টহলও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কেবল নাইট ওয়াচম্যান ছিলেন। তাঁকে ঘুষ দেওয়া হয়। দলের মধ্যে ছিলেন কিম ই-হিয়কের স্ত্রী, যিনি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি ওই অবস্থাতেই পায়ে হেঁটে খনি অঞ্চল পেরিয়ে যান একা একা। সেটাই ছিল পরিকল্পনার অংশ। প্রত্যেকেই আগে থেকে ঘুরে বেড়িয়ে এলাকার পথটা মুখস্ত করে নিয়েছিলেন। এদিকে দলের সবচেয়ে খুদে সদস্যরা, যাদের বয়স যথাক্রমে চার ও ছয়, তাদের বালির বস্তায় করে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সকলে মিলে দল বেঁধে বোটে ওঠে। কিম ই-হিয়ক জানিয়েছেন, গোটা পথ জুড়ে তাঁর বুক ধড়ফড় করছিল। এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় তিনি রাঁধুনি হিসেবে চাকরি করেন। সকলকে শোনান নিজেদের পালিয়ে আসার গল্প। যা এই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। উত্তর কোরিয়ায় মানুষ কত বিপণ্ণ, তা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে এই একটি ঘটনা থেকেই।
